তিহাস কখনো একই পোশাকে ফিরে আসে না। সে চরিত্র বদলায়, সময় বদলায়, ভৌগোলিক মানচিত্র পাল্টায়। কিন্তু ইতিহাসের অন্তর্গত স্বভাব বদলায় না। ক্ষমতার মোহ, অহংকারের উল্লম্ফন, বাস্তবতা অস্বীকারের প্রবণতা-এই উপাদানগুলো যুগে যুগে একই রকম থেকে যায়। তাই সাদ্দাম হোসেনের পতন আর নিকোলা মাদুরোর পরিণতি একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। দূরত্ব হাজার হাজার মাইল, সংস্কৃতি ভিন্ন, ভাষা আলাদা-তবু ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করালে দুই শাসকের গল্প আশ্চর্যজনকভাবে একই সুরে বাজে।

এই মিল কোনো দৈব ঘটনা নয়। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক রোগের লক্ষণ-যেখানে শাসক নিজেকে জনগণের প্রতিনিধি নয়, বরং জনগণের ভাগ্যের একমাত্র মালিক মনে করতে শুরু করেন। রাষ্ট্র তখন আর একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকে না; রাষ্ট্র হয়ে ওঠে একজন মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, ভয় ও অহংকারের সম্প্রসারণ। এই অবস্থায় সমালোচনা মানেই শত্রুতা, ভিন্নমত মানেই ষড়যন্ত্র, আর বাস্তবতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু।

হুগো চাভেজ ছিলেন সেই রাজনীতির এক প্রতীকী চরিত্র। তিনি লাতিন আমেরিকার জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকে কেবল জনপ্রিয়ই করেননি, বরং তাকে রোমান্টিক মহিমাও দিয়েছেন। তাঁর বক্তৃতায় ছিল বিপ্লবের ভাষা, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধের ডাক, আর দরিদ্র মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর দৃশ্যমান সাহস। জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে ‘শয়তান’ আখ্যা দেওয়ার সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসা ও বিতর্ক-দুটিই সৃষ্টি করেছিল। লক্ষ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাহসী নেতা, যিনি শক্তিশালীদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন।

কিন্তু রাজনীতি কেবল সাহসের শিল্প নয়; এটি ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানও। বক্তৃতার উত্তাপ যত তীব্রই হোক, রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা সেখানে অপেক্ষা করে থাকে নির্লিপ্ত ও নির্মম হয়ে। চাভেজ সেই বাস্তবতাকে পুরোপুরি বুঝতে পারেননি বা বুঝেও উপেক্ষা করেছিলেন। তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলাকে তিনি বিপ্লবী কল্পনায় ভাসালেন। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বিতাড়িত করা হলো, বড় বড় শিল্প জাতীয়করণ করা হলো, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হলো। কিন্তু উৎপাদনব্যবস্থার বৈচিত্র্য বাড়ল না, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হলো না, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলো না।

জনতুষ্টিবাদের মূল সমস্যা এখানেই। এটি মানুষের ক্ষোভকে ভাষা দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে না। এটি রাষ্ট্রকে শত্রু ও মিত্রে ভাগ করে, কিন্তু রাষ্ট্রকে কার্যকর করতে পারে না। চাভেজের সময় এই দুর্বলতাগুলো তেলের উচ্চ দামের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। বিপ্লবী ভাষা দিয়ে অর্থনীতির ফাটল ঢেকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসে কোনো ঋণ চিরকাল বাকি থাকে না।

চাভেজের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই ঋণের সুদসহ আদায়ের সময় শুরু হয়। তাঁর উত্তরসূরি নিকোলা মাদুরো সেই বিপর্যয়ের ভার বহন করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। একজন সাধারণ মানুষ-বাসচালক থেকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা-রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায়। এই উত্থান অনেকের কাছে গণতন্ত্রের বিজয় বলে মনে হতে পারত। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল সামাজিক পটভূমি দিয়ে হয় না; হয় দৃষ্টি, কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে।

মাদুরো রাজনীতি শিখেছিলেন অনুকরণের মাধ্যমে। তিনি ভাবলেন, চাভেজের ভাষা, চাভেজের শত্রু চিহ্নিতকরণ, চাভেজের যুক্তরাষ্ট্রবিদ্বেষই তাঁকে টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু আদর্শ ছাড়া অনুকরণ ফাঁপা হয়ে যায়। চাভেজ যেখানে একটি বিপ্লবী কল্পনার জন্ম দিয়েছিলেন, মাদুরো সেখানে সেই কল্পনার প্রতিধ্বনি মাত্র হয়ে থাকলেন। বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।
এর ফল ছিল ভয়াবহ। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ধসে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। খাদ্য, ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আর দুর্নীতির মিলনে বাজার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক সংকট তৈরি হয়-পাঁচ কোটির কম জনসংখ্যার দেশ থেকে পঞ্চাশ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রব্যর্থতার এক জীবন্ত দলিল।

স্বৈরশাসনের একটি চিরচেনা বৈশিষ্ট্য হলো-শাসক যত দুর্বল হন, রাষ্ট্র তত বেশি সামরিকীকৃত হয়। মাদুরোর ভেনেজুয়েলায় সেটিই ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট ভবন রূপ নেয় ভারী অস্ত্রসজ্জিত দুর্গে। রাস্তায় নামে সশস্ত্র বেসামরিক বাহিনী। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি গড়ে ওঠে আনুগত্যভিত্তিক মিলিশিয়া। নিরাপত্তার নামে ভয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাষ্ট্র তখন আর নাগরিকের নিরাপত্তা দেয় না; রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এই দৃশ্য ইতিহাসে নতুন নয়। ২০০৩ সালে ইরাকেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। সাদ্দাম হোসেন বিস্ময়ে দেখেছিলেন, মার্কিন সেনাদের বহর দজলা নদীর পাড় ধরে বাগদাদের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে। তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি, এত দ্রুত তাঁর ক্ষমতার দেয়াল ভেঙে পড়বে। তাঁর ধারণা ছিল-ভয়, বাহিনী আর নিরাপত্তা বলয় তাঁকে অজেয় করে তুলেছে। বাস্তবে দেখা গেল, রাষ্ট্র যখন একজন মানুষের অহংকারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেটি প্রথম বড় ধাক্কাতেই ধসে পড়ে।

মাদুরোও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকে একইভাবে ভুল পড়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল নিষেধাজ্ঞা আর কূটনৈতিক চাপে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতি কখনো একরৈখিক নয়। নেতৃত্ব বদলায়, কৌশল বদলায়, আর সেই সঙ্গে বদলায় প্রতিক্রিয়ার ধরন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন সেই পরিবর্তনের প্রতীক। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের মতো ধীরগতির চাপের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ে দৃশ্যমান ফল চাইতেন, এক আঘাতে সমস্যার সমাধান করতে চাইতেন।

এই বাস্তবতা না বুঝে মাদুরো আলোচনার পথ বন্ধ করে দেন। নিজেকে প্রাসাদে বন্দী করে তিনি ভাবলেন, শক্তি প্রদর্শনই নিরাপত্তা। ইতিহাস বলে, এটি সব সময়ই ভুল হিসাব। শেষ পর্যন্ত তাঁকেও পায়জামা পরা অবস্থায় নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য বিশ্ব দেখেছে-যেমন একদিন বিশ্ব দেখেছিল গর্তে লুকিয়ে থাকা সাদ্দামকে।

লাতিন আমেরিকা ও আরব বিশ্বের মধ্যে একটি গভীর কাঠামোগত মিল রয়েছে। দুই অঞ্চলই দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিনির্ভর, জনতুষ্টিবাদী নেতৃত্বের বোঝা বইছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সামরিকীকৃত রাজনীতি, আবেগনির্ভর শাসন-এই উপাদানগুলো দুই সমাজেই ঘুরে ফিরে আসে। ২০০৭ সালে কারাকাস শহর বাইরে থেকে যতটা ঝকঝকে মনে হয়েছিল, তার চারপাশে গড়ে ওঠা বস্তিগুলো ছিল আসন্ন বিপর্যয়ের নীরব সংকেত। উন্নয়নের আলো শহরের কেন্দ্রে আটকে ছিল; প্রান্তে জমে উঠছিল ক্ষোভ ও বঞ্চনা।

বিপ্লবী নীতির ফলে জীবনযাত্রার মান দ্রুত অবনতি ঘটে। সশস্ত্র বেসামরিক পাহারা, ভয় আর অনিশ্চয়তা শহুরে জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। একসময় যেখানে এক ডলার সমান ছিল দুই বলিভার, সেখানে মুদ্রার মান নেমে আসে প্রায় পাঁচশ বলিভারে। অর্থনীতি তার নিজস্ব নিয়মে প্রতিশোধ নেয়-নীরবে, নির্মমভাবে।

সাদ্দাম, গাদ্দাফি, চাভেজ কিংবা মাদুরো- এঁদের কেউই ইতিহাসের খলনায়ক হয়ে জন্মাননি। তাঁরা উঠে এসেছিলেন বৈষম্য, ক্ষোভ আর অবিচারের ভেতর থেকে। তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পরিবর্তনের, ন্যায়ের, মর্যাদার। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে যখন তারা প্রতিষ্ঠান নয়, নিজেদের অমরতা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, তখনই ইতিহাস তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাস বক্তৃতা মনে রাখে না, মনে রাখে সিদ্ধান্ত। মনে রাখে সেই সাহস, যা ক্ষমতা ছাড়তে পারে। যে নেতা নিজেকে রাষ্ট্রের সমান
মনে করেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে রাষ্ট্রের ধ্বংসস্তূপেই ফেলে যায়। ইতিহাস ফিরে আসে না-কিন্তু যারা ইতিহাস থেকে শেখে না, তাদের জীবনে ইতিহাস ফিরে আসে শাস্তি হয়ে।

এই শিক্ষা শুধু ভেনেজুয়েলা বা ইরাকের জন্য নয়। এটি বিশ্বের প্রতিটি ভঙ্গুর গণতন্ত্র, প্রতিটি ক্ষমতালোভী শাসক, প্রতিটি জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা। ক্ষমতার অহংকার ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইতিহাসের রায় চূড়ান্ত।

কলামিস্ট ও সংগঠক