‘গণতন্ত্র’ এই শব্দটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত, অথচ সবচেয়ে কম ভেবে দেখা শব্দগুলোর একটি। আমরা প্রায়ই গণতন্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি- ভোটের দিন, ব্যালট বাক্স, ফলাফল ঘোষণা। নির্বাচন হলো, ফল হলো- আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি, মনে করি গণতন্ত্র টিকে গেল। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

একজন নাগরিকের কাছে গণতন্ত্রের অর্থ ভোটের দিনের দৃশ্য নয়; বরং ভোটের পর রাষ্ট্র তার মর্যাদা ও কণ্ঠকে কীভাবে বিবেচনা করে, সেটাই গণতন্ত্রের আসল মানদণ্ড। যখন সে নিজেকে রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান বলে অনুভব করে, যখন তার কথা শোনা হয় বা অন্তত শোনার ভান করা হয় না- এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে জানায়, সে সত্যিই গণতন্ত্রে বাস করছে কি না। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে, গণতন্ত্র কি শুধুই নির্বাচন, নাকি সুশাসন দিয়েই তার অস্তিত্ব টিকে থাকে?

গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি বলে, জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস। জনগণ নির্বাচন মাধ্যমে সেই ক্ষমতা প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করে। সেই অর্থে নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র কল্পনাই করা যায় না। নির্বাচন জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রকাশ। কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তবতা আমাদের এটাও শেখায়, নির্বাচন একদিনের ঘটনা, আর শাসন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যদি নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র মানদণ্ড হতো, তাহলে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া সব রাষ্ট্রই কার্যকর গণতন্ত্রে পরিণত হতো। বাস্তবে তা হয়নি। বহু দেশে নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার, জবাবদিহির ঘাটতি এবং নাগরিক আস্থার সংকট। বরং আমরা এমনও দেখেছি, রাজতন্ত্র কিংবা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গুলো ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা মূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সফল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। ফলে গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরে আটকে রাখা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত করে। একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা নাগরিক আস্থার প্রথম ধাপ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার ওপর নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বহুলাংশে নির্ভর করে।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই শেষ হয়ে যায় না। নির্বাচন যতই গ্রহণযোগ্য হোক, যদি নির্বাচনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সেই নির্বাচন ধীরে ধীরে তার গণতান্ত্রিক তাৎপর্য হারাতে শুরু করে। নাগরিকের কাছে তখন গণতন্ত্র একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়- যার সঙ্গে তার জীবনের বাস্তবতার খুব কম সংযোগ থাকে।এই জায়গাতেই সুশাসনের ধারণাটি সামনে আসে। সুশাসন বলতে কেবল দক্ষ প্রশাসন বা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বোঝায় না। সুশাসন মানে এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা সীমার মধ্যে থাকে, প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির আওতায় কাজ করে, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার কার্যকরভাবে সুরক্ষিত থাকে।
গণতন্ত্র যদি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসনে পরিণত হয়, তবে তা সহজেই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও স্বেচ্ছাচারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সুশাসনই সেই ভারসাম্য তৈরি করে, যা গণতন্ত্রকে সংযত, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখে।
আইনের শাসন সুশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। আইনের শাসন ছাড়া গণতন্ত্র একটি ফাঁপা কাঠামোতে পরিণত হয়। আইন যদি কেবল বইয়ে থাকে, কিন্তু প্রয়োগে বৈষম্য দেখা যায়, তাহলে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা তাই গণতন্ত্রের জন্য মৌলিক গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট শুধু বিচারিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্যের রক্ষাকবচ। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া যদি দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট ও ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে ন্যায়বিচার নাগরিক অধিকারের বদলে বিশেষ সুবিধায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই অবস্থায় গণতন্ত্রের ভিত্তিও নীরবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
গণতন্ত্র ও সুশাসনের সম্পর্ক অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়লে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ দুর্বল হয়, এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। যখন উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না, তখন নাগরিকের মধ্যে বঞ্চনা, অনাস্থা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি–এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, যেখানে সুশাসন দুর্বল, সেখানে দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়ন টেকসই হয় না। অর্থাৎ সুশাসন কেবল রাজনৈতিক আদর্শ নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই বার্তা দেয়। অনেক দেশ নিয়মিত নির্বাচন করেও গণতান্ত্রিক সংকটে ভুগছে, আবার কিছু দেশে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও প্রশাসনিক জবাবদিহির কারণে গণতন্ত্র তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়- গণতন্ত্র কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই গণতন্ত্রকে নির্বাচন বনাম সুশাসনের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা উচিৎ নয়। নির্বাচন গণতন্ত্রের দরজা খুলে দেয়, আর সুশাসন সেই দরজার ভেতরে রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালিত করে।
এই প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসন কেবল সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং মতপ্রকাশের সুযোগ। প্রশ্ন করার সংস্কৃতি, সমালোচনার পরিসর ও ভিন্নমতের সহনশীলতাই গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখে। যদি নির্বাচন থাকে, কিন্তু মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়; যদি প্রতিষ্ঠান থাকে, কিন্তু জবাবদিহির চর্চা না থাকে—তাহলে গণতন্ত্র কেবল কাঠামোগত উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
গণতন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আইন ও প্রতিষ্ঠান যত শক্তই হোক, রাজনৈতিক আচরণ যদি অসহিষ্ণু হয়, ক্ষমতার সীমা মানার মানসিকতা না থাকে, তবে গণতন্ত্র টেকসই হয় না। বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে। এই অর্থে সুশাসন শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়; এটি রাজনৈতিক নৈতিকতারও প্রতিফলন।
তাই প্রশ্নটি নতুন করে, স্পষ্ট করে তোলা জরুরি- গণতন্ত্র কি নির্বাচন দিয়ে শুরু হয়, নাকি সুশাসন দিয়েই টিকে থাকে?

উত্তর সম্ভবত এই ‘গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয় নির্বাচন দিয়ে, কিন্তু তার অস্তিত্ব রক্ষা পায় সুশাসনের মাধ্যমে’। নির্বাচন গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে, আর সুশাসন সেই ভিত্তির ওপর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।
গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের দৃষ্টি কেবল ভোটের দিনের দিকে নয়, বরং ভোটের পরের প্রতিটি দিনের দিকে রাখতে হবে। নির্বাচনের পর রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন ও কার্যকর, নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, এসব প্রশ্নই গণতন্ত্রের প্রকৃত মানদণ্ড।

গণতন্ত্র কোনো সাময়িক উৎসব নয়, যা পাঁচ বছর পরপর এসে শেষ হয়ে যায়। গণতন্ত্র হলো একটি চলমান দায়িত্ব, প্রতিদিনের চর্চা ও দায়বদ্ধতার বিষয়। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রের সূচনা সম্ভব নয়, তবে কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্রের পরিপূর্ণতা নিশ্চিত করে না। সুশাসন ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়, এর আসল ভিত্তি নিহিত রয়েছে নাগরিকের আস্থা, অংশগ্রহণ ও বিশ্বাসে।