নতুন বাংলাদেশ গড়ার শ্লোগান এখন সর্বত্র। দেওয়ালে, মঞ্চে, বক্তৃতায়, সামাজিক মাধ্যমে-সবখানে একই উচ্চারণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কী দিয়ে গড়া হবে এই নতুন বাংলাদেশ? কারা গড়বে? কাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে? সামনে নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে দেশ। একটি সরকার বিতাড়িত হয়েছে। ক্ষমতার শূন্যতা পূরণের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে কি সত্যিই জনগণ আছে, নাকি আবারও ক্ষমতা বদলের এক পুরনো চক্র সক্রিয় হচ্ছে?

যারা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, রাজপথে দাঁড়িয়ে শহীদ হয়েছেন- তাদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ কি সত্যিই গড়ে উঠবে? নাকি তাদের রক্তের সাথে আবারও বেঈমানি করা হবে? যারা আজ মনোনয়নপত্র জমা দিচ্ছেন, যারা ক্ষমতার দৌড়ে নেমেছেন- তাদের উদ্দেশ্য কি সত্যিই সৎ? তারা কি কৃষক, জেলে, রিকশাচালক, চা বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও ধনী- সবাইকে নিয়ে একটি সমান রাষ্ট্র কল্পনা করেন? নাকি অরাজকতা, অন্যায়, অবিচার ও বিশৃঙ্খলার পুরনো চিত্রই নতুন নামে ফিরে আসবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আমাদের রাজনীতির চরিত্রের দিকে তাকাতে হয়। রাজনীতি শব্দটির আভিধানিক অর্থ আমরা জানি- রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল, ক্ষমতার ভারসাম্য, জনস্বার্থ রক্ষার প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির দিকে তাকালে এই সংজ্ঞাগুলো অনেক সময় নিষ্প্রভ ও অকার্যকর মনে হয়। তখনই মনে পড়ে যায় মার্কিন রাজনৈতিক ব্যঙ্গকার ল্যারি হার্ডিম্যানের সেই বহুল প্রচলিত উক্তি- রাজনীতি মানে বহু রক্তচোষা পরজীবীর সম্মিলন। এটি কোনো ভাষাবৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নয়; এটি একটি তীক্ষ্ণ রূপক, যা ক্ষমতার নৈতিক পতনের বিরুদ্ধে নির্মম সত্য উচ্চারণ করে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই উক্তিটি আর নিছক ব্যঙ্গ বলে মনে হয় না। বরং এটি এক ভয়ংকর আয়না, যেখানে আমরা আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। রাজনীতি এখানে আর জনকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে না; বরং ক্ষমতা দখল, ক্ষমতা সংরক্ষণ এবং সুবিধা বণ্টনের যন্ত্রে রূপ নিয়েছে। আদর্শের জায়গায় এসেছে আনুগত্য, নৈতিকতার জায়গায় এসেছে সুবিধা, আর জনস্বার্থের জায়গায় এসেছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত হিসাব।

একটি রাষ্ট্র তখনই গভীর সংকটে পড়ে, যখন রাজনীতি মানুষের সেবা করার বদলে মানুষকে ব্যবহার করার কৌশলে পরিণত হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নাগরিককে দেখা হচ্ছে ভোটের সংখ্যা হিসেবে- মানুষ হিসেবে নয়। নির্বাচন এখানে উৎসব নয়; আতঙ্ক। ভিন্নমত এখানে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নয়; বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই বাস্তবতায় রাজনীতি ধীরে ধীরে সমাজের রক্ত শুষে নিচ্ছে- পরজীবীর মতো নীরবে, কিন্তু নিষ্ঠুরভাবে।

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ যত বাড়ে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো তত দুর্বল হয়ে পড়ে। সংসদ, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন- সবকিছু যখন রাজনৈতিক আনুগত্যের ছাঁচে ঢালা হয়, তখন রাষ্ট্র কাঠামো টিকে থাকে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের আত্মা ক্ষয়ে যেতে থাকে। আইন তখন আর ন্যায়ের হাতিয়ার থাকে না; হয়ে ওঠে ক্ষমতার ঢাল। নাগরিক তখন অধিকারভোগী নয়; বরং সন্দেহভাজন এক সত্তা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসর আজ দুই চরম বাস্তবতার মাঝখানে বন্দী। একদিকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার বলয়, অন্যদিকে দুর্বল, বিভক্ত ও দমনকৃত বিরোধী রাজনীতি। এই শূন্যতার ভেতর জন্ম নেয় সুবিধাভোগী শ্রেণি- যাদের কাছে আদর্শ নয়, বরং পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোই প্রধান দক্ষতা। দল বদলায়, অবস্থান বদলায়, বক্তব্য বদলায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে মৌলিক পরিবর্তন আসে না। রাজনীতি এখানে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি না হয়ে স্থবিরতার রক্ষক হয়ে দাঁড়ায়।

ল্যারি হার্ডিম্যানের উক্তিটির সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য হলো- পরজীবী কখনো একা থাকে না। তারা দলবদ্ধভাবেই বাঁচে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও শোষণ কখনো একক নয়। রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার এবং সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীদের একটি অদৃশ্য জোট রাষ্ট্রের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার সাথে জড়িয়ে পড়ে। তারা রাষ্ট্র থেকে নেয়- ক্ষমতা, সম্পদ, নিরাপত্তা- কিন্তু রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না।

এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। তরুণরা রাজনীতিকে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। তাদের কাছে রাজনীতি মানে নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা ও অপমান। কিন্তু রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো মানেই রাজনীতিকে পরজীবীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। এটিই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ভালো মানুষ রাজনীতি এড়িয়ে চলে, আর খারাপ মানুষ রাজনীতিকে পেশা বানিয়ে নেয়।

প্রশ্ন হলো- এই রাজনীতি কি অনিবার্য? ইতিহাস বলে, রাজনীতি সবসময় এমন ছিল না। রাজনীতি তখনই মানবিক থাকে, যখন তা নৈতিক সীমা মেনে চলে এবং জবাবদিহির মধ্যে থাকে। কিন্তু নৈতিকতা আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি গড়ে ওঠে চর্চায়, সংস্কৃতিতে এবং নাগরিক সচেতনতায়। বাংলাদেশের সংকট এখানেই- আমরা রাজনীতিকে দায়িত্ব নয়, সুবিধা হিসেবে দেখেছি।

এই বাস্তবতায় নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের আগে রাজনীতির সংজ্ঞাই নতুন করে লিখতে হবে। রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতায় যাওয়া নয়; ক্ষমতার সীমা মানাও রাজনীতি। রাজনীতি মানে কেবল জয় নয়; ন্যায্যতাও রাজনীতি। রাজনীতি মানে কেবল শাসন নয়; সেবাও রাজনীতি। যতদিন এই বোধ গড়ে না উঠবে, ততদিন শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ হবে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের ওপর- আমরা কি সচেতন নাগরিক হয়ে বাঁচতে চাই, নাকি নীরব শোষিত জনতা হয়ে থাকতে রাজি? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনীতিবিদরা দেবেন না। দিতে হবে আমাদেরই। কারণ রাজনীতি কোনো দূরের বিষয় নয়; রাজনীতি আমাদের দৈনন্দিন জীবন, আমাদের নীরবতা, আমাদের আপস এবং আমাদের সাহসেরই প্রতিফলন।
আমরা যদি চুপ থাকি, পরজীবীরা উৎসব করবে। আর যদি আমরা প্রশ্ন করি, অংশগ্রহণ করি, জবাবদিহি দাবি করি- তবে রাজনীতি

আবার মানুষের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য হবে। রাজনীতি চাইলে রক্তচোষা হতে পারে, আবার চাইলে মানুষের জীবনে রক্ত সঞ্চালনের কাজও করতে পারে। নতুন বাংলাদেশ কোনটি হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখন আমাদেরই। 

কলামিস্ট ও সংগঠক