পানি মানুষের জীবন ও সভ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে প্রায় ৭৫% পানি সমুদ্রের মধ্যে মিশে থাকলেও শুধুমাত্র ৩% পানি মিষ্ট জল হিসেবে বিদ্যমান, এবং এর মধ্যে মাত্র ১% ব্যবহারযোগ্য পানির উৎস হিসেবে রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পানির অভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বে ৭০০ মিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছে, এবং এ পরিসংখ্যান দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশও এ সমস্যার শিকার, যেখানে পানির স্তরের হ্রাস, দূষণ এবং নদীর দূষণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, ফলে পানি সংগ্রহের প্রথাগত পদ্ধতিতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আবার গ্রামীণ এলাকায় পানি সংকট এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের সমস্যা প্রকট আকারে দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং পারকোলেশন পিট দুটি এমন টেকসই প্রযুক্তি, যা পানি সংকট মোকাবিলায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

পানির সংকটের বর্তমান অবস্থা
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস: বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের দ্রুত হ্রাস হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ইডউই) মতে, ঢাকায় প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানি স্তর ২-৩ মিটার কমে যাচ্ছে। অধিক জনগণের পানির চাহিদা এবং অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে এই স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরো বড় সমস্যা তৈরি করবে। অনেক অঞ্চলে খাল ও পুকুরগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, ফলে পানি সংগ্রহের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে।

নদী ও জলাভূমির হ্রাস: বাংলাদেশের নদীগুলো, যেগুলো এক সময় পানির জন্য সবচেয়ে বড় উৎস ছিল, এখন দূষণের কারণে বিপদে পড়েছে। শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য, এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে নদী, পুকুর, জলাভূমি এবং খালগুলো সংকুচিত হচ্ছে। ঢাকার মতো বড় শহরে নদীর ময়লা-দূষণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, পানি ব্যবহারযোগ্য হতে দূরে থাক, এসব পানি স্বাস্থ্যগত সমস্যাও তৈরি করছে। জলাভূমির দখলও বাড়ছে, যেগুলো এক সময় পানির স্তরের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। জলাভূমির সংকুচিত হওয়ার ফলে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

লবণাক্ততার বৃদ্ধি: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য মিঠাপানির অভাব দেখা যায় এবং লবণাক্ত পানির প্রবাহ তীব্র হতে থাকে। এই পরিস্থিতি কৃষিকাজে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে, পাট, ধান, সবজি এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধারের সংকোচন এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং: একটি কার্যকর পদ্ধতি

রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং একটি প্রাচীন এবং অত্যন্ত কার্যকরী প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এটি কার্যকরী এবং লাভজনক হয়ে উঠেছে। এটি এমন একটি পদ্ধতি যা বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যবহার করা যায়।

পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য
১.বৃষ্টির পানি সরাসরি ব্যবহার
বৃষ্টির পানি সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব, যা টয়লেট ফ্লাশ, গৃহস্থালির পরিষ্কারের জন্য এবং কৃষি কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পানি সংকট অনেকটাই কমে যায়।
২. ভূগর্ভস্থ স্তর পুনরুদ্ধার
রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহিত পানি মাটির গভীরে প্রবাহিত হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ করতে সহায়ক হয়। এতে শুধু পানি সরবরাহ নয়, ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের হ্রাসও কমানো যায়। এটি সেচের কাজে অত্যন্ত উপযোগী।
৩. পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি
এটি প্রাকৃতিক পানির চক্রকে সহায়তা করে এবং পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবহার করে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো সম্ভব।

রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের উপকারিতা
১. পানি সংকট কমানো
এটি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে এলাকাভিত্তিক পানির চাহিদা পূরণের উপায় প্রদান করে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে যেখানে পানি সংকট প্রকট, সেখানে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
২. পানি সরবরাহে বৈচিত্র্য
ভূগর্ভস্থ পানি বা টিউবওয়েলের উপর নির্ভরতা কমানো যায়। এর মাধ্যমে, পানি সরবরাহে নতুন উৎস তৈরি হয় এবং এটি বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে কার্যকরী হতে পারে।
৩. শক্তির সাশ্রয়
পানি উত্তোলনের জন্য যেসব বিদ্যুৎ বা মেশিন ব্যবহার করা হয়, তা থেকে সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ হয়।

পারকোলেশন পিট: ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধারে আধুনিক সমাধান
পারকোলেশন পিট একটি পদ্ধতি যা মাটির নিচে জল প্রবাহের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত কার্যকরী একটি পদ্ধতি।

পদ্ধতির ধাপ
১. নির্ধারিত স্থানে ৩-৫ মিটার গভীর একটি গর্ত খোঁড়া হয়।
২. গর্তের নিচে বালি, কংকর, পাথর ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে পিটটি পূর্ণ করা হয়।
৩. বৃষ্টির পানি সরাসরি এই গর্তে জমা হয়ে মাটির গভীরে প্রবাহিত হয় এবং ভূগর্ভস্থ স্তরকে পুনরুদ্ধার করে।

পারকোলেশন পিটের সুবিধাসমূহ
১. ভূগর্ভস্থ স্তর রিচার্জ
এটি ভূগর্ভস্থ স্তরকে পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে, যা সেচ এবং পানির প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য অপরিহার্য।
২. মাটি সেচের জন্য সাশ্রয়ী
এটি মাটির পানির স্তর উপরে তুলে এনে সেচ ব্যবস্থা কার্যকর করে, ফলে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
৩. লবণাক্ততার প্রতিকার
পারকোলেশন পিট উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি প্রবাহ কমাতে সাহায্য করে, যা কৃষিকাজে উপকারী।

বাস্তবায়নের সম্ভাবনা
শহরাঞ্চলে, বিশেষত বৃহত্তম শহরগুলিতে, রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করে পানির সংকট মোকাবিলা করা যেতে পারে। বড় বড় বহুতল ভবনগুলিতে এই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হলে, তা শহরের পানির চাহিদা কমাতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।
গ্রামাঞ্চলে যেখানে পানির সমস্যা বেশ তীব্র, সেখানে পারকোলেশন পিট স্থাপন একটি সাশ্রয়ী এবং কার্যকরী সমাধান হতে পারে। এর মাধ্যমে কৃষকরা ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে এবং সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাবেন।
পারকোলেশন পিট বিশেষভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে কার্যকরী হতে পারে, যেখানে লবণাক্ততা সমস্যা অনেকটাই বেড়ে গেছে। এটি লবণাক্ত পানি সমস্যার সমাধানে সাহায্য করবে এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করবে।

ভারতের তামিলনাড়ু মডেল
তামিলনাড়ু রাজ্যে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রযুক্তি চালু করার পর, পানির স্তর অনেকটাই পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং খরার সময় কৃষকদের সহায়তা করতে সক্ষম হয়েছে।

রাজস্থানের তালাব পদ্ধতি
রাজস্থানে বড় বড় জলাধার এবং পারকোলেশন পিট ব্যবহৃত হচ্ছে, যা পানি সংকট কমাতে সাহায্য করেছে। সেখানে প্রায় ৮০% সেচ জল এবং ৫০% পানির চাহিদা এই পদ্ধতির মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছে।

বাংলাদেশের স্থানীয় উদাহরণ
চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং পরীক্ষামূলকভাবে কার্যকর হয়েছে, এবং এই ব্যবস্থা স্থানীয় জনগণের পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
১. সচেতনতার অভাব
অনেক জনগণ এখনও রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং পারকোলেশন পিটের উপকারিতা সম্পর্কে অবগত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো, স্থানীয় কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি সম্ভব।
২. অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
এ ধরনের প্রযুক্তি প্রবর্তনে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে তহবিলের ব্যবস্থা করলে, এটি সকলের জন্য সহজলভ্য করা সম্ভব।
৩. কারিগরি দক্ষতার অভাব
স্থানীয় জনগণের মধ্যে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এছাড়া, সঠিক উপকরণের ব্যবহারও নিশ্চিত করা উচিত।
বিশ্বজুড়ে পানির সংকট বাড়ছে, তবে এই সংকট মোকাবিলায় রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং পারকোলেশন পিট একটি কার্যকরী সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন হলে, শুধুমাত্র পানির সরবরাহের উন্নতি হবে না, বরং পরিবেশও রক্ষা পাবে। এটি যে শুধু পানির সংকটের সমাধান দিবে তা নয়, বরং এক নতুন পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতও তৈরি করবে।
‘প্রত্যেক ফোঁটা পানি সংরক্ষণ করুন, ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন।’

লেখক:
সামাজিক ও পরিবেশ কর্মী
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ফেনী সরকারি কলেজ
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইকোরেভল্যুশন
সমন্বয়কারী, ইকোরেইন