বিলোনিয়া স্থলবন্দর, সোনাগাজীর ইপিজেড, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ বন্যাসহ বিভিন্ন কারণে ফেনী দেশের জন্য সেনসিটিভ জায়গায় অবস্থান করছে। তাই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফেনী জেলার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাড়িয়েছে।
ফেনীর এই গুরুত্ব এখন থেকে না, ভাটির বাঘ শমসের গাজীর সময় থেকে ছিলো৷ পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুভপুর ব্রীজের প্রেক্ষাপট আট নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধের গতি-প্রাকৃতি পাল্টে দিয়েছে বলে লোকমুখে শোনা যায়। ফেনীকে নিয়ে ভৌগোলিক কারণে সবসময় ভারত, মায়ানমার ও আমেরিকাসহ বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত সব দেশের কিছু পরিকল্পনা ছিলো। এখনও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের ফরেন পলিসি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে ফেনীর নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পৃথিবীর বহু দেশে শুধু মাত্র কৌশলগত কারণে ক্ষদ্রাতিক্ষুদ্র এলাকাকে প্রদেশ বা স্টেট করা হয়েছে । ভারতের ত্রিপুরা, গোয়া, আন্দামান, চীনের হান, কাজাকাস্তানের নগন্য কারাবাখ সহ প্রায় ৩০০ উদাহরণ আছে। ভারত ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে ত্রিপুরাকে অঙ্গ রাজ্য করে। ভারত ১৯৭২ সালে যা বুঝলো আমরা এখনও বুঝলামনা কেন? । ফেনী অর্থনৈতিক, সামরিক, ভূ-রাজনৈতিক, কৌশলগত ও অখন্ডতার প্রয়োজনে বিভাগীয় সদর হওয়া আবশ্যক। ফেনীর এক চতুর্থাংশ আয়তন নিয়ে রাজ্য হয়েছে এমন নজিরও আছে পৃথিবীতে। এক . চীনের ম্যাকাও মাত্র ৩২ কিলোমিটার কিন্তু এটি একটি প্রদেশ কৌশলগত কারণে। দুই. মেয়উটি, ফ্রান্সের একটি প্রদেশ, যার আয়তন ৩৭৪ কিলোমিটার মাত্র। সামুত সংখ্যাম থাইল্যান্ডের একটি প্রদেশ যার আয়তন ৪১৬ কিলোমিটার। ফেনী জেলার আয়তন এর চেয়ে অনেক বেশি। এরকম প্রায় ৩০০ এর উপরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছোট এলাকা অথচ এগুলোকে সে সব দেশ প্রদেশের/ বিভাগের মর্যাদা দিয়েছে।
ফেনী শুধু ফেনী না, ফেনীর সাথে সাংস্কৃতিকভাবে একীভুত অঞ্চল আছে কয়েকটি, যেমন: নোয়াখালীর কোম্পানীগন্জ, সেনবাগ, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, খাগড়াছড়ির একাংশ, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড। সুতরাং ফেনীকে বিভাগ করার যৌক্তিকতা অনেক। তাই, ফেনীকে শুধু আয়তনের বা জনসংখ্যার বিচারে না দেখে কৌশলগত ও অবস্থানগত বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদ গুলোর মধ্যে সমতট ছাড়া আর সবগুলোই বিভাগ হয়ে গেছে। তেমনি প্রাচীন জনপদের রাজধানীগুলো যেমন ইসলামাবাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিভাগ হয়ে গেছে। একমাত্র শমশেরনগর বা ফেনী এক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার।
জাতীয় এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে ও ফেনীবাসীর এই কঠিন সময়ে নিজেদেরকে মেলে ধরার এবং আগ্রাসন প্রতিরোধে ভূমিকা রেখে শমসের গাজীর উত্তরসূরী হিসেবে ফেনীবাসীকে পরিচয় দেবার সময় এসেছে। আগামী দিনে ফেনী বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে পরিণত হবে। সেজন্য ফেনীর রাজনীতিবীদ, যুব-তরুণ এবং ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
রাষ্ট্রীয় ও ফেনীর নিরাপত্তার স্বার্থে ফেনীবাসীর জন্য এখনই করণীয় কিছু প্রস্তাবনা রাখছি:
১। অতি শীঘ্রই আগ্রাসন প্রতিরোধের জন্য আগ্রাসন প্রতিরোধ কমিটি/আগ্রাসন প্রতিরোধ মঞ্চ/আগ্রাসন প্রতিরোধ জোট/আগ্রাসন প্রতিরোধ পরিষদ/ফেনী রক্ষা পরিষদ নামে আলাদা প্লাটফর্ম দাঁড় করাতে হবে। এটি ফেনী জেলার থানায় থানায় গোলটেবিল, মানববন্ধন এবং আলোচনা করবে। এই কাজ চলবে আগামী এক দশক ব্যাপী ।
২। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে “বঙ্গোপসাগর সংরক্ষণ জোট” প্লাটফর্ম গঠন করতে হবে, যারা গবেষণা করবে, প্রকাশনা তৈরি করবে এবং প্রতিরোধ করবে ।
৩। ফেনী সীমান্তে গত ৫০ বছরের নির্যাতন নিয়ে ছবি প্রদর্শনী, বুকলেট প্রকাশ এবং বিশ্ব মিডিয়ায় সেগুলো তুলে আনতে হবে। ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর পরশুরাম সীমান্তে কৃষক মেজবাহকে নির্মমভাবে খুন করা হয়, সেটি সামনে আনতে হবে ।
৪। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনানিবাস স্থাপন ও পাবলিক ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়াও বিমানবন্দর ও মেডিকেল কলেজের দাবিতেও সোচ্চার থাকতে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধান উপদেষ্টা বরাবর এ সকল জোটের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি প্রদান করা যেতে পারে ।
৫। জিওপলিটিক্যাল কারণে ফেনীর গুরুত্ব, ফেনী নিয়ে আন্তর্জাতিক ততপরতা, মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অবদান, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে ফেনীবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো দেশ তথা বিশ্ববাসীকে জানান দিতে হবে।
লেখক-
নির্বাহী পরিচালক
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট - সিজিডি