প্রজ্ঞাপন জারি হয়, পদায়নও হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরশুরামে যোগদান করেন না উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) গত দুই বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে পাঁচবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, সীমান্তবর্তী অবস্থান, ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি নাকি প্রশাসনিক অস্বস্তি-কোন কারণে কর্মকর্তারা এ উপজেলা এড়িয়ে যাচ্ছেন, এনিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৩ মে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মোতাহার হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ইউএনও হাসনাত জাহান খানকে পরশুরামের ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হয়। তবে প্রশাসনিক একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি এ উপজেলায় যোগদান করছেন না।
এর আগে, গত ২৭ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ইউএনও সিফাত মো. ইশতিয়াক ভূঁইয়াকে পরশুরামে পদায়ন করা হলেও তিনি যোগদান করেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইল উপজেলার ইউএনও মো. মোশারফ হোসেনকে পরশুরাম উপজেলায় পদায়ন করা হয়। তিনি যোগদানের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকায় বিএসটিআইতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলি হন।
একই বছরের ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ রাবার বোর্ডের সহকারী পরিচালক রেজওয়ানা চৌধুরীকে পরশুরাম উপজেলার ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হলেও ওইদিন রাতেই পূর্বের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার কাজী তাহমিনা শারমিনকে এ উপজেলায় ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হয়। কয়েকদিন পর জানা যায়, তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি নেবেন, যার কারণে বদলি বাতিল হয়ে যায়।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের পটপরিবর্তনের পর পরশুরাম উপজেলায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যান ২০২৩ সালের ২৪ আগস্টে যোগদানকৃত আফরোজা হাবিব শাপলা। ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর তাকে সিলেটের রাজনগর উপজেলায় পদায়ন করা হয়। একইদিন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ইউএনও আরিফুর রহমানকে পরশুরাম উপজেলায় পদায়ন করা হলে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অন্য একটি প্রজ্ঞাপনে তাকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদায়ন করা হলে ফুলগাজী উপজেলার ইউএনও ফাহরিয়া ইসলাম একই বছরের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত পরশুরাম উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৩০ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসএম শাফায়াত আখতার নূর। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার সাদিয়া সুলতানা ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন। সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল সাদিয়া সুলতানাকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলি করা হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম শাফায়াত আখতার নূর আবারও ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে একের পর এক ইউএনও যোগদান না করায় পরশুরামের মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও প্রশাসনকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্যও করছেন।
পরশুরাম সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক মজুমদার মিলন বলেন, যোগদান না করার কারণ কি? হরহামেশাই এগুলো দেখছি-এই পদায়ন করেছে, আবার তারা যোগদান করছে না।
চাকুরিজীবী জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের অবস্থা উগান্ডা, নাইজেরিয়া থেকেও কি খারাপ হয়েছে? কেন সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এটি লজ্জা এবং মারাত্মক আশঙ্কারও বটে।
ফুলগাজী বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজের প্রভাষক জাকির হোসাইন বলেন, সরকারি আদেশ প্রতিপালিত হয় না, এতে বোঝা যায় প্রশাসন দুর্বল। দুর্বল প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে ইউএনও পদায়ন করা হলেও যোগদান না করায় প্রশাসনিক কাজ ও নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপজেলাবাসী। এসিল্যান্ড একইসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করায় কাজ করতে তাকেও হিমশিম খেতে হয়।
সংকটের নৈপথ্যে কী
পরশুরামের পদায়ন বা বদলি করা হলেও ইউএনওরা যোগ দিতে চান না। সীমান্তবর্তী হলেও এই উপজেলায় বহুগুণী মানুষের বসবাস। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, সহকারী সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়ে প্রায় ৩০ জন পরশুরাম উপজেলার সন্তান কর্মরত রয়েছেন। তবুও কেন ইউএনওরা এখানে যোগ দেন না, এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নানা প্রশ্নের তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে বিভিন্ন সময়ে পাঁচজন ইউএনওকে এ উপজেলায় পদায়ন করা হলেও তারা বদলির আদেশ বাতিল করে অন্য স্থানে চলে গেছেন।
একাধিক প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ৫ আগস্টে দেশের অবস্থা পরিবর্তনের পর পরশুরাম উপজেলায় ইউএনও হিসেবে যারা যোগ দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারাসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার ও মিমস ভিডিও তৈরি করে তাদের সম্মানহানি করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভুয়া আইডি তৈরি করে ঢালাওভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অতীতে পরশুরাম উপজেলায় কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এসব বিষয়ও কর্মকর্তাদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপর একটি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর পরশুরামকে অনেক কর্মকর্তা ‘দুর্যোগপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ’ উপজেলা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে পরশুরাম সীমান্তের বল্লামুখার বেড়িবাঁধ ও মুহুরী নদীর ভাঙনে ভয়াবহ বন্যা গণমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বজুড়ে প্রত্যক্ষ করেছে। এসব কারণেও সরকারি কর্মকর্তারা এ উপজেলায় আসতে চান না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি এক কর্মকর্তা বলেন, ফেনীর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও ভারত সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরাম। অনেকেই এখানে বদলিকে শাস্তিমূলক পোস্টিং হিসেবে দেখেন। এজন্য অনেক কর্মকর্তা এখানে যোগদানে অনাগ্রহ দেখান।
এসব দাবির বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, কেন ইউএনওরা এখানে যোগদান করতে চান না, তার নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যাচ্ছে না। বন্যার বিষয়টিও একটি কারণও হতে পারে। তবে ইউএনও না থাকলে একটি উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা খুবই কঠিন। দ্রুত ইউএনও পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
