২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর। কৃষক মেজবাহারকে সীমান্ত এলাকা থেকে জোর করে ধরে নৃশংসভাবে হত্যা করে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। মেজবাহারের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে অকুলে ভাসছেন তিন মেয়ে ও স্ত্রী। ঠিকভাবে সংসার চলছে না। ঘর ভেঙ্গে যাওয়ার মেরামত হয়নি। অর্থের অভাবে মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
পরশুরাম উপজেলার উত্তর গুথুমা গ্রামের টিলাপাড়ার মৃত মফিজুর রহমানের ছেলে মেজবাহার। মেজবাহার হত্যাকান্ডের তিন বছর শেষ হয়েছে। বাবার জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে এখনো মেজবাহারকে খুঁজে ফেরেন মেয়েরা।
জানা গেছে, মানুষের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতেন কৃষক মেজবাহার। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গরু ব্যবসা করতেন। ২০২২ সালে সাড়ে তিন কানি জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছিলেন তিনি। জমির ধান কাটার সময় ধরে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর ১৬ নভেম্বর সকালে সীমান্তের কাঁটাতারের পাশে শূন্যরেখার ভারতীয় অংশে মেজবাহারের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে সেখান থেকে লাশ নিয়ে যায় বিএসএফ। ১৭ দিন পর ২৯ নভেম্বর বিলোনিয়া চেকপোস্ট দিয়ে মেজবাহারের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উত্তর গুথুমার মাইল্যাটিলায় তাকে দাফন করা হয়।
চার মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সাজানো সংসার ছিল মেজবাহারের। কিন্তু মেজবাহারকে হারিয়ে তছনছ হয়ে যায় তার সংসার। মৃত্যুর আগে প্রায় ৭ লাখ টাকা ধারদেনা করে বড় মেয়ে মর্জিনা আক্তার মুন্নিকে (২১) বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। মেঝো মেয়ে তাজনেহার (১৬) ও সেজো মেয়ে বিবি হাজেরা (১৪) গুথুমা চৌমুড়ী ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় নবম ও অষ্টম শ্রেণীতে পড়ালেখা করছেন। ছোট মেয়ে জান্নাতুন নাঈমা (১০) বাড়ির পাশে একটি নূরানী মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ছেন। পরিবারে কোন উপার্জন না থাকায় মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেজবাহারের স্ত্রী মরিয়ম আক্তার (৪০)।
তিনি বলেন, কষ্টের কোন শেষ নেই। গত তিন বছর ধরে পরিবারের কোনো উপার্জন নেই। কষ্ট করে মেয়েদের পড়ালেখার খরচ চালিয়েছি। আর পারছি না। এখন তাদের পরীক্ষা চলছে। জানুয়ারি থেকে তাদের পড়ালেখা বন্ধ করে দেব।
মরিয়ম আক্তার বলেন, বেতের কাজ করে ঝুড়ি, ওড়া ও লাই বিক্রি করে সামান্য আয় করি। সে আয় দিয়ে মেয়েদের খাওয়া ও বেতন পরিক্ষার ফিস, খাতা-কলম, বই কেনা সম্ভব হয় না। শিক্ষকের বেতন দিতে না পারায় প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছি। তিনি জানান, ঘরের চারপাশের টিনগুলো মরিচা ধরে ভেঙে গেছে। চালের দিন ফুটা হয়ে গেছে, বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। এখন রাত হলে ভয় করে। বিয়ের উপযুক্ত মেয়েদেরকে নিয়ে ঘরে থাকি। বাড়ির জায়গাটা নিয়েও ঝামেলা হচ্ছে। এটি নাকি আমাদের নামে নেই।
প্রতিবেদকের সাথে মরিয়ম আক্তারের কথোপকথনের সময় পাশে এসে দাঁড়ায় ছোট মেয়ে জান্নাতুন নাঈমা। ছলছল চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন মায়ের দিকে। মরিয়ম আক্তার বলেন, প্রতিদিন মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় টিফিনের টাকা খুঁজে নাঈমা। তার সাথের মেয়েরা স্কুলে নাস্তা করে। কিন্তু তাকে কোন টাকা দিতে পারি না।
নিহত মেজবাহরের বোন পারুল আক্তার (৪০) বলেন, আমরা বাবা মায়ের দুই সন্তান শুধু। ভাই মারা যাওয়ার আগে সাত লাখ টাকা ধার দেনা করে বড় মেয়েকে বিয়ে দেন। সেই সব ধারদেনা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। মেয়েদেরকে খাওয়া পড়া দিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল ইসলাম জানান, মেজবাহারের মৃত্যুর পর মরিয়ম আক্তার মেয়েদেরকে নিয়ে খুব কষ্টে আছেন। কেউ পাশে দাঁড়ালে মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
