দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে চালু হতে যাচ্ছে ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্রাবাস। দূর-দূরান্ত থেকে কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে ফেনী পৌরসভার ফলেশ্বরে নির্মিত চারতলা ভবনের ১০৮ আসনবিশিষ্ট এ ছাত্রাবাসটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, ২০০৩ সালে তৎকালীন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবদিন ছাত্রাবাসটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ছয় বছর পর ২০০৯ সালে তৎকালীন কলেজ অধ্যক্ষ আবদুর রব এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় ছাত্রাবাসটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, বন্ধ থাকার সুযোগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা সেটি দখল করে বসবাস করতেন।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বর্তমান কলেজ প্রশাসন ছাত্রাবাসটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১৪ জন শিক্ষার্থীকে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা সেখানে উঠবেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিনের অবহেলায় ছাত্রাবাসটি পরিত্যক্ত ও ভুতুড়ে পরিবেশে পরিণত হয়েছিল। সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ফটকে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ এবং প্রবেশপথের দুই পাশে ঝোপঝাড়ে ঘেরা পরিবেশ। মূল সড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে নির্জন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় একসময় এটি মাদকসেবী ও বহিরাগতদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
ছাত্র না থাকলেও সরকারি সম্পদ পাহারার দায়িত্বে থাকা নুরনবী সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজ অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে জনমানবহীন নীরব পরিবেশ। জানালার কাঁচ ভাঙা, কক্ষ জুড়ে মাকড়সার জাল। নিচতলার এক কোণে পড়ে আছে ভাঙাচোরা পুরোনো টেবিল-চেয়ার। দেয়ালে ঝুলছে ২০১২ সালের আবাসিক শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপ ছবি, যা এখন কেবল স্মৃতির সাক্ষী। পশ্চিম পাশের ডাইনিং রুম ধুলাবালি ও মাকড়সার জালে ঢাকা।
দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে ৯টি করে মোট ২৭টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে চারজন শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা ছিল। তবে দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় কক্ষগুলোর চৌকি, চেয়ার-টেবিল, পানির ট্যাপ ও শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
২০০৯ সাল থেকে প্রায় এক যুগ শিক্ষার্থীরা এখানে থাকলেও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে ছাত্রাবাসটি প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমান কলেজ অধ্যক্ষ এনামুল হক খোন্দকার দাবি করেন, একসময় ছাত্রাবাসটি তৎকালীন সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
তিনি বলেন, ছাত্রলীগের নেতারা ছাত্রাবাস দখল করে নিজেদের মতো করে পরিচালনা করতেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক টাকা আদায় করা হলেও তা কলেজ ফান্ডে জমা হতো না। ফলে প্রায় ৭ লাখ টাকা গ্যাস বিল এবং ২ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে যায়। বকেয়া বিলের কারণে একপর্যায়ে বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
ছাত্রাবাস চালু প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, ইতোমধ্যে ১৪ জন শিক্ষার্থীকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারা সরকারি নির্ধারিত অগ্রিম ভাড়াও জমা দিয়েছে। ছাত্রাবাসকে বসবাসযোগ্য করতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। একজন শিক্ষককে হল সুপার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
হল সুপারের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ মিয়া জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা হয়েছে। মূল ভবন ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা উঠলে ধীরে ধীরে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ছাত্রাবাস পুনরায় কোনো ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা দুজন শিক্ষক নিয়মিত তদারকির দায়িত্বে থাকবো। আমরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করব এবং শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেব।
এ বিষয়ে ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি নোমানুল হক বলেন, ভবিষ্যতে এ ছাত্রাবাসকে অন্য কোন নেতা যদি এখানকার ছাত্রদের ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিবেশ নষ্ট করতে চাই আমরা তা রুখে দেব। ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য কলেজ প্রশাসনের সাথে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবো।
নিরাপদ পরিবেশের আকাঙ্ক্ষা শিক্ষার্থীদের
ছাত্রাবাস পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কক্ষ, হলরুম ও ডাইনিং রুমের পূর্ণ সংস্কার শেষ না হওয়ায় বরাদ্দ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী এখনই উঠতে আগ্রহী নন। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার পর চালুর উদ্যোগ নেয়া হলেও ছাত্রাবাসের পরিবেশ, কলেজ থেকে দূরবর্তী অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি তুলছেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, কলেজ প্রশাসনের সঠিক নজরদারি ও তদারকি না থাকলে আবারও অন্য কোন ছাত্র সংগঠন এর নিয়ন্ত্রণে যাবে।
সিট বরাদ্দ পাওয়া নাজমুস সাকিব নামে দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি ছাত্রাবাসে উঠার জন্য টাকা জমা দিয়েছি। ছাত্রাবাসে পড়াশোনা ও থাকার পরিবেশ এখনও হয়নি। এখানে এখনও অনেক সংস্কার ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হবে।
মাঈনুল ইসলাম অনিক নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ফেনী সরকারি কলেজের ছাত্রাবাস আছে এটাই অনেক শিক্ষার্থী জানে না। খোলা-বন্ধ তো পরের কথা। আমাদের কলেজে চট্টগ্রাম, মিরসরাইসহ দূরবর্তী উপজেলার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। তাদের জন্য ছাত্রাবাসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দ্রুত চালুর দাবি জানাই।
শহিদুল ইসলাম বলেন, সাধারণত কলেজের আশপাশেই ছাত্রাবাস থাকে। অথচ আমাদের ছাত্রাবাসটি কলেজ থেকে অনেক দূরে হাসপাতাল মোড়ে। যাতায়াতে প্রায় ৩০ টাকা ভাড়া লাগে। এর ওপর ছয় বছর ধরে এটি বন্ধ। কলেজের কাছাকাছি হলে শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা হতো।
মেহেদী হাসান আরাবী বলেন, অতীতে ছাত্রাবাস চালু থাকলেও পরিবেশ শিক্ষার্থী-বান্ধব ছিল না। আমরা চাই, ভবিষ্যতে যেন এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে না যায়।
সালাহ উদ্দিন বলেন, বিগত স্বৈরাচার আমলে ছাত্রাবাসটি ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আমরা চাই, এবার যেন তা আর না হয়।
মাহের আমিরুল হক বলেন, ছাত্রাবাসে নানা অনিয়ম ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটত। ভবিষ্যতে এসব রোধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। আমরা শিক্ষার্থীরাও সহযোগিতা করব।
