কিছু মানুষের বিদায় নিছক মৃত্যুসংবাদ নয়—তা হয়ে ওঠে একটি সময়ের নীরব ভাঙন। সদ্যপ্রয়াত লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক ফিরোজ আলমের প্রস্থান তেমনই এক গভীর বেদনাময় মুহূর্ত, যা ফেনীর মননশীল পরিমণ্ডলকে নিঃশব্দে কাঁপিয়ে দিয়েছে। ১৯৬৬ সালের ১১ মার্চ জন্ম নেওয়া এই জ্ঞানসাধক ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ পৃথিবীর দৃশ্যমান পথ ছেড়ে অনন্তের যাত্রায় পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু সত্য এই—যারা শব্দ দিয়ে সময়কে ধারণ করেন, তারা কখনো পুরোপুরি বিদায় নেন না; তারা থেকে যান স্মৃতির অনির্বাণ আলো হয়ে।
“যাহা কিছু হারায়, গোপনে গোপনে
জীবনের মাঝেই তারে ফিরে পাই।”
(২)
ফিরোজ আলম ছিলেন নীরবতার এক সৌন্দর্য—অহংকারহীন প্রজ্ঞার এক শান্ত প্রতীক। তাঁর ধপধপে শুভ্র দাঁড়ি যেন সময়ের দীর্ঘ সাধনার সাক্ষী, তাঁর সংযত কণ্ঠ যেন অভিজ্ঞতার পরিমিত আলো। তিনি কখনো নিজেকে সামনে আনেননি; বরং কাজকে সামনে রেখেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব মনে করিয়ে দেয়—
“বড় হতে হলে বড় নয়, হতে হয় গভীর;
নিভৃত আলোয় জ্বলে সত্যের প্রদীপ ধীর।”
(৩)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।”
এই পঙ্ক্তির অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা যেন ফিরোজ আলমের জীবনদর্শনের প্রতিধ্বনি। তিনি মানুষের মাঝেই বেঁচে থাকতে চেয়েছেন—নিজের গবেষণায়, লেখায় এবং জনপদের স্মৃতিকে ধরে রাখার নিরলস প্রয়াসে। তাঁর কাছে ইতিহাস ছিল মানুষের আত্মপরিচয়ের আয়না, আর সাহিত্য ছিল মানবিকতার ভাষা।
(৪)
শিক্ষাজীবনের সূচনা বিরিঞ্চি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে; এরপর ফেনী জি এ একাডেমী ও ফেনী কলেজ—এই পথচলা ছিল জ্ঞানের প্রতি নিবিড় অনুরাগের গল্প। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের সাদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তিনি আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎকে একসূত্রে যুক্ত করেন। তাঁর জীবন যেন বলে—
“জ্ঞান যার আলোর দিশা,
তার পথ কখনো অন্ধকার হয় না।”
(৫)
১৯৮৮ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে তিনি সময়ের সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে পেশা ছিল না, ছিল নৈতিক দায়িত্ব। তিনি জানতেন—একটি সত্য উচ্চারণ করা মানে ভবিষ্যতের কাছে দায়মুক্ত হওয়া। তাঁর লেখনী সংযত হলেও তার ভেতরে ছিল গভীর মানবিকতা।
“শব্দ যদি সত্য হয়, নীরবতাও কথা কয়;
কলম যদি জাগে একদিন, ইতিহাস জেগে রয়।”
(৬)
পরবর্তীতে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডে কর্মজীবনে যুক্ত হয়ে তিনি জীবনের বাস্তব প্রয়োজন পূরণ করেছেন, কিন্তু কখনো থামাননি জ্ঞানচর্চার পথ। ব্যাংকের হিসাবের খাতা আর লেখার খাতা—দুটি ভিন্ন জগত হলেও তাঁর কাছে ছিল একই সাধনার অংশ। জীবিকার বাস্তবতা ও আত্মার আহ্বান—এই দুই ধারার মিলনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন জীবনের অনন্য ভারসাম্য।
“রুটি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আলো;
জীবন শুধু বেঁচে থাকা নয়, জেগে থাকাও ভালো।”
(৭)
স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় তাঁর অবদান ফেনীর সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে দীর্ঘদিন সমৃদ্ধ করবে। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ— ফেনী জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য, আমার শহর ফেনী, ফেনীর আউলিয়া পাগলা মিঞা (র.) জীবনকথা, ফেনীতে ভাষা আন্দোলন, ফেনীর কথা ু নবীন চন্দ্র সেন এবং ফেনীর শহিদ বুদ্ধিজীবী—একটি জনপদের আত্মপরিচয়কে দলিলভিত্তিকভাবে সংরক্ষণ করেছে। তিনি বুঝেছিলেন—
“যে মাটির ইতিহাস নেই, সে মাটির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।”
(৮)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরেকটি পঙ্ক্তি—
“মৃত্যুতে যারে হারাই, জীবনে তারে পাই।”
আজ এই কথার গভীরতা নতুনভাবে অনুভূত হয়। ফিরোজ আলম বেঁচে থাকবেন তাঁর শব্দে, তাঁর গবেষণায়, তাঁর দায়বদ্ধতায়। একটি সমাজ তখনই সমৃদ্ধ হয়, যখন সেখানে এমন মানুষ থাকেন—যারা নীরবে থেকেও সময়ের সত্যকে ধারণ করেন।
“মানুষ চলে যায়, রেখে যায় আলো;
সেই আলোয়ই পথ খুঁজে পায় আগামীকাল।”
(৯)
তাঁর স্মরণে লেখা কবিতার পঙ্ক্তিগুলো আজ যেন আরও ভারী হয়ে শোনা যায়—
“আজ একটি আকাশ নীরবে ভেঙে পড়েছে—
শব্দ হয়নি, তবু কেঁপে উঠেছে সময়ের ভিত।
নিভৃতচারী এক মানুষ
কলমের নিঃশব্দ প্রার্থনায়
জীবন কাটিয়েছেন শব্দের ভেতর।”
এই পঙ্ক্তিগুলো এক নীরব সাধকের প্রতিচ্ছবি—যেখানে শব্দ হয়ে ওঠে ইবাদত, গবেষণা হয়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে সংলাপ।
“যে কলম ভালোবাসে মানুষ,
তার কালি কখনো শুকায় না।”
(১০)
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কর্মের উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী। ফিরোজ আলম সেই দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকারের পথে যাত্রা করেছেন। আজ ফেনীর আকাশে একটি নক্ষত্র নিভে গেছে, কিন্তু তার আলো নিভে যায়নি। মহান আল্লাহ তাঁর বিদেহী আত্মাকে মাগফিরাত দান করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসে স্থান দিন। গভীর শ্রদ্ধায় শেষ করি—
“আপনি আমাদেরই লোক, আমাদেরই স্বজন—
নীরবতার ওপারে যে অনন্ত শান্তির দেশ,
সেখানে মেলুক আপনার চির প্রশান্তি।”
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

লেখক : সাহিত্যিক ও সংগঠক