ঈদের আনন্দ মানেই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। সারা বছরের কর্মব্যস্ততা শেষে পরিবার পরিজন নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য আমরা উন্মুখ হয়ে থাকি। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে রাজধানী ঢাকা বা বড় বড় শহরগুলো ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার ধুম পড়ে যায়। কিন্তু এই খুশির জোয়ারে গা ভাসানোর মাঝেও একটি ছোট দুশ্চিন্তা আমাদের মনের কোণে থেকেই যায় আর তা হলো আমাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা শখের ঘরটি।
আপনি যখন কয়েক দিনের জন্য বাসা খালি রেখে ভ্রমণে বা গ্রামে যাচ্ছেন তখন আপনার অগোচরে অনেক ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। অসাধু চোরচক্র যেমন সুযোগের সন্ধানে থাকে তেমনি বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা গ্যাস লিকেজ থেকেও বড় ধরণের বিপদ হতে পারে। তাই যাত্রা শুরুর আগে শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োয় প্রয়োজনীয় কিছু কাজ ভুলে গেলে চলবে না। ছিমছাম আর সুরক্ষিত ঘর রেখে নিশ্চিন্তে ঈদ কাটাতে আপনাকে যে বিষয়গুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে তা নিয়ে আজকের এই আয়োজন।
সবার আগে আসে নিরাপত্তার কথা। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে প্রতিটি কক্ষের জানালা এবং বারান্দার গ্রিল বা দরজা ভালোভাবে বন্ধ আছে কি না তা বারবার পরখ করে নিন। অনেক সময় আমরা কেবল মূল দরজায় তালা দিয়ে নিশ্চিন্ত হই কিন্তু পেছনের জানালার ছিটকিনি দিতে বা লক করতে ভুলে যাই। প্রতিটি তালা ঠিকমতো লেগেছে কি না তা অন্তত দুবার টেনে পরীক্ষা করুন। ঈদের সময় যেহেতু অনেক এলাকা জনমানবহীন থাকে তাই চোরদের নজরদারি বেড়ে যায়। যদি সম্ভব হয় তবে দরজায় একটির জায়গায় দুটি মজবুত তালা ব্যবহার করুন। দামী গয়না বা নগদ টাকা ঘরে না রেখে বিশ্বস্ত কারো কাছে বা ব্যাংকের লকারে রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অনেকেই ভুলে ফ্যান বা লাইট জ্বালিয়ে রাখেন। টিভি, কম্পিউটার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং ওয়াশিং মেশিনের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলোর প্লাগ সরাসরি সকেট থেকে খুলে রাখুন। এতে কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই হবে না বরং ভোল্টেজ ওঠানামা বা শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকেও আপনার ঘর রক্ষা পাবে। তবে আপনার ফ্রিজে যদি পচনশীল খাবার বা মাংস থাকে তবে ফ্রিজের সুইচ অন রাখতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে আগে একবার তারের সংযোগগুলো পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো যাতে হুট করে কোনো বিপর্যয় না ঘটে।
গ্যাস এবং পানির লাইন বন্ধ করা আপনার জীবনের নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত। সামান্য একটি গ্যাস লিকেজ আপনার পুরো বাড়িকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই গ্যাস সিলিন্ডারের রেগুলেটর বা মেইন লাইন যাই হোক না কেন গ্যাসের চাবি অবশ্যই বন্ধ করে বের হবেন। অনেক সময় ছুটিতে বাড়ি থেকে ফিরে এসে আমরা অভ্যাসবশত সাথে সাথেই দেশলাই জ্বালাই যা খুবই বিপজ্জনক। ফিরে এসে আগে জানালা ও দরজা খুলে দিন এবং বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করুন। এরপর কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে চুলা জ্বালান। একইভাবে পানির কলগুলো টাইট করে বন্ধ করুন। সামান্য পানির চুইয়ে পড়া আপনার ঘরের মেঝে বা কাঠের আসবাব নষ্ট করে দিতে পারে এবং পানির অপচয় ঘটায়।
পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। অনেক দিন ঘর বন্ধ থাকলে বদ্ধ পরিবেশে মশা আর পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাথরুম, রান্নাঘর বা বারান্দার কোণে যেন এক ফোঁটা পানিও জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। জমানো পানিতে ডেঙ্গু বা এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই সব পাত্র উপুড় করে রাখুন এবং কমোডের ঢাকনা বন্ধ করে দিন। ফ্রিজের পেছনের ট্রে বা ছাদের কোনো টব যেন পানির আধার না হয়ে দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করুন। এতে আপনি যখন ছুটিতে থাকবেন তখন আপনার ঘর থাকবে জীবাণুমুক্ত এবং পরিষ্কার।
নিজের ছুটির কথা এবং ঘর ফাঁকা থাকার বিষয়টি আপনার বাসার নিরাপত্তাকর্মী বা অন্তত একজন বিশ্বস্ত প্রতিবেশীকে জানিয়ে রাখুন। তাদের মোবাইল নম্বর আপনার ফোনে সংরক্ষণ করুন যাতে কোনো প্রয়োজন হলে তারা আপনাকে দ্রুত জানাতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনি কোথায় যাচ্ছেন বা আপনার ঘর এখন খালি আছে এমন তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ার না করাই ভালো। মনে রাখবেন আপনার একটু সচেতনতাই পারে আপনার ঘরকে নিরাপদ রাখতে এবং আপনার ঈদকে সত্যিকারের আনন্দময় করতে। সাবধানতাই হোক আমাদের সুরক্ষার মূল মন্ত্র। প্রিয়জনদের সাথে আপনার ঈদ যাত্রা শুভ হোক এবং আপনি ফিরে আসুন এক সতেজ আর নিরাপদ আবাসে। সুস্থ থাকুন এবং নিরাপদে ঈদ উদযাপন করুন।
