ফেনী ট্রাঙ্ক রোডের পূর্বপাশে এক দশমিক ১৯ কিলোমিটার খাল দখল করে আছে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসহ ১১০ দখলদার। এই অবৈধ দখলদারদের তালিকায় রয়েছে ফেনী পৌরসভা, ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুল, ফেনী মডেল হাইস্কুল এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী। ফেনী সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় সূত্র হতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

ফেনী পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নথিপত্রে পিটিআই খালটি দাউদপুর খাল হতে শুরু হয়ে ফেনী জেল রোডে শেষ হয়েছে। খালটির গড় প্রস্থ সাড়ে ১৫ ফুট হলেও সর্বোচ্চ প্রস্থ ছিল ৪০ ফুট এবং সর্বনিম্ন ১০ ফুট। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফাহমিদা আক্তার জানান, খালটি দখল হয়েছে সর্বোচ্চ ১৫ ফুট এবং সর্বনিম্ন ২ ফুট।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় ফেনী জেলা পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার পর এই খালটি অবৈধ দখলের বিষয়টি সামনে আসে।

খাল দখল করে অবৈধভাবে ভবন, দোকানপাট গড়ে ওঠা প্রসঙ্গে একাধিক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, খালটি হত্যা করা হয়েছে ড্রেন তৈরি করে। খালের তুলনায় অনেক সরু ড্রেন নির্মাণের পর আর খালের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দাউদপুর খাল হতে শহরের জেল রোড পর্যন্ত খালটি হত্যা করে করা হয়েছে একটি আবৃত ড্রেন। এ প্রসঙ্গে খোঁজ নিতে গিয়ে ফেনী পৌরসভা হতে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘পৌর প্রশাসন ও সেবা উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ড্রেন নির্মাণ করা হয়। কাগজে-কলমে ড্রেনটির দৈর্ঘ্য ৮২০ মিটার এবং সর্বোচ্চ প্রস্থ ১২ ফুট ও সর্বনিম্ন ৭ ফুট। পৌরসভা সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে এ প্রকল্প নেওয়া হয়। বিকল্প পায়ে হাঁটার পথ হিসেবে ব্যবহারের জন্য ড্রেনটিকে আবৃত করা হয়।

খাল দখল করে দোকানপাট-ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গে একাধিক স্থানীয় ব্যবসায়ী দাবি করেন, ইজারাপ্রাপ্ত নির্ধারিত ৪০ ফুটের মধ্যে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাপজোখের সময় আমাদের ডাকা হয়নি।

খালের উপর নির্মিত ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলের ভবন প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, এ খালটির প্রস্থ কতটুকু ছিল তা আমিও নিশ্চিত হয়। শৈশব থেকেই স্কুলের সামনে এ জায়গাটি সরু ড্রেন হিসেবে দেখেছি। খালটি দখল হলেও কবে এটি দখল হয়েছে তা নিশ্চিত নই। সরকারের পক্ষ থেকে খালটি উদ্ধারের পরিকল্পনা থেকে থাকলে আমরাও সাথে আছি।

খাল দখল উচ্ছেদের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মনিরা হক জানান, এ মুহূর্তে সারাদেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পিটিআই খাল দখলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর এ বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

শীর্ষ দখলদার ফেনী পৌরসভা

ফেনী জেল রোডে ড্রেন নির্মাণের পর তা দখল করে মার্কেট গড়েছে ফেনী পৌরসভা। অবৈধ এ মার্কেটে ৬১টি দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এখানে শেষ নয়, ড্রেন দখল করে তৈরি করা হয়েছে মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের স্থান। ফেনীর ঐতিহ্যবাহী নবী হোটেলের পেছনে সম্পূর্ণ খাল দখল করে আরও একটি ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে নবী হোটেল মালিক সূত্র জানায়, নির্দিষ্ট পরিমাণ সালামি দিয়ে এ ঘরটি তারা পেয়েছেন। মাসে ভাড়া গুনছেন ১২ হাজার টাকা। 

খালের ওপর ড্রেন এবং ড্রেন দখল করে অবৈধ ঘর নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামছুদ্দিন দৈনিক ফেনীকে জানান, দোকান ঘরগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ উচ্চতায় রয়েছে। এতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না। অবৈধ ঘরগুলো ভাঙার কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোন পরিকল্পনা নেই।

নবীনচন্দ্রের পরিকল্পনায় খনন করা হয় খালটি

‘আধুনিক’ ফেনী গড়ার রূপকার ছিলেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক কবি নবীনচন্দ্র সেন। তারই পরিকল্পনায় ফেনী দাউদপুর থেকে পিটিআই এলাকা পর্যন্ত এই খালটি খনন করা হয়েছিল। যেটি বর্তমানে পিটিআই খাল নামে পরিচিত পেয়েছে। ফেনীর ইতিহাস প্রাসঙ্গিক ‘ফেনী: কালের ইতিহাস’ বইতে সংকলিত নবীনচন্দ্র সেনের আত্মজীবনীর খণ্ডাংশে খালটি প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, “ ট্রাঙ্ক রোডের এক পার্শ্বের গড় এরূপ খুলিয়া দিয়া, ঠিক রাস্তার পার্শ্বে পার্শে¦ ‘কোঁদা’ চলিবার খাল করিয়াছিলাম। বর্ষার সময় এ সকল খাল দিয়া চলিতে কি সুবিধা ও আনন্দ বোধ হইত, তাহা আর কি বলিব?”

কোঁদা বলতে নবীনচন্দ্র সেন তাঁর লেখায় বলেছেন, “বর্ষার সময়ে ফেনীর মত স্থানে নৌকায় যাতায়াতের বড় প্রয়োজন ও সুবিধা। একটি গাছ কুঁদিয়া এ অঞ্চলে নৌকা প্রস্তত হয়, তাহাকে কোঁদা বলে।”