২৫০ শয্যা ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্নাসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শোয়েব ইমতিয়াজ নিলয়। তিনি জানান, সোমবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্না ও নানা অনিয়মের ঘটনায় অন্তত ১০ জন নার্সের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। সংবেদনশীল এই স্থানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অব্যবস্থাপনায় কেবল নার্সদের দায়ী করা হলেও কোনো চিকিৎসক বা কর্মকর্তার গাফেলতি খুঁজে পাননি তদন্ত দল।

তবে জেলার সরকারি এ হাসপাতালে সেবা নিতে আসা একাধিক প্রসূতির স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালের গাইনি বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন ডা. তাহিরা খাতুন রোজী, ডা. নিলুফা সুলতানা ও ডা. তাহমিনা আক্তারসহ একাধিক চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে প্রসূতি ওয়ার্ডে এসব অনিয়মের ব্যাপারে কর্মরত চিকিৎসকরা জানতেন। বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসকরা এখানে নার্সদের তৈরি করা বিরিয়ানি, শীতের পিঠাসহ নানা খাবার খেতেন। কিন্তু হাসপাতালে এমন অনিয়মের ঘটনায় কেবল নার্সদের দায়ী করায় বোঝা যাচ্ছে তারাই এ ওয়ার্ডের ‘হর্তাকর্তা’। চিকিৎসকরা নার্সদের অধীনে কাজ করছেন এমন মন্তব্যও করছেন সেবাগ্রহীতারা।

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দৈনিক ফেনীতে ‘ওটিতে রান্নাবান্না, ঝুঁকিতে প্রসূতিরা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও কমিটি একদিন আগেই তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে।

সূত্র আরও জানিয়েছে, তদন্তে অভিযোগের বেশ কিছু বিষয়ে সত্যতা মিলেছে। এজন্য কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করেছে। তদন্তে অনিয়মে সম্পৃক্ত নার্সদের বদলির সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নার্সিং সুপার ভাইজার কল্পনা রানী মন্ডল ও সিনিয়র স্টাফ নার্স রানী বালা হালদারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নের সুপারিশও করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. শোয়েব ইমতিয়াজ নিলয় দৈনিক ফেনীকে বলেন, আমরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সোমবার প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের বিষয়ে অনেকগুলো সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্তাধীন বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। আমরা আশা করছি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন। তবে এ তদন্তে চিকিৎসকদের কোন সম্পৃক্ততা মেলেনি।

এ বিষয়ে জানতে তদন্ত কমিটির সভাপতি ডা. জালাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তদন্তনাধীন বিষয়ে কিছু বলা যাবে না। তবে তদন্ত কমিটি একাধিক বিষয়ে সুপারিশ করেছে। আমরা প্রতিবেদনটি চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) বরাবর পাঠিয়েছি।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. ফজলে রাব্বি দৈনিক ফেনীকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যাদেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তদন্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. জালাল হোসেন ও সদস্য সচিব ছিলেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শোয়েব ইমতিয়াজ। কমিটির আরও একজন সদস্য ছিলেন ডা. মশিউর রহমান।

প্রসঙ্গত, ফেনী জেনারেল হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে রান্নাবান্না ও নানা অনিয়ম নিয়ে দৈনিক ফেনীতে প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলাজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয় থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

নতুন করে ১৫ নার্সকে পদায়ন
ফেনী জেনারেল হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্নাসহ গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে দুই নার্সকে বরখাস্তের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে এবার একসঙ্গে ১৫ জন নার্সের পদায়ন করেছে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর।

গতকাল মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বদলি আদেশের চিঠি এখনো দাপ্তরিকভাবে হাতে পাইনি। তবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি বদলির বিষয়টি সত্য। আমাদের এখানে নার্সের সংকট রয়েছে। এ বিষয়ে ইতোপূর্বে আমরা মন্ত্রণালয়ে চাহিদা দিয়েছিলাম। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের জারি করা আদেশে সংশ্লিষ্ট নার্সদের আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের হাসপাতাল থেকে কাউকে বদলি করা হয়নি।

এর আগে সোমবার (১২ জানুয়ারি) জারি করা এক অফিস আদেশে নোয়াখালী, কুমিল্লা, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে কর্মরত ১৫ জন নার্সকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, জনস্বাস্থ্য সেবা সচল রাখার স্বার্থেই এ পদায়ন।

ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, বদলিকৃত নার্সদের আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে ১৬ জানুয়ারি বিকেল থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি কার্যকর হবে।

এর আগে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে গ্যাসের চুলায় রান্নাবান্না, অবাধ যাতায়াত এবং শৃঙ্খলাহীনতার কারণে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের সংক্রমণের উচ্চঝুঁকি নিয়ে সর্বপ্রথম দৈনিক ফেনীতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। পাশাপাশি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরও আলাদাভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন বলে জানা গেছে। এ কাণ্ডে জড়িত থাকায় ইতোমধ্যে হাসপাতালের নার্সিং সুপার ভাইজার কল্পনা রানী মন্ডল ও সিনিয়র স্টাফ নার্স রানী বালা হালদারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।