ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রান্নাঘর স্থাপনসহ নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায়ে দুই সিনিয়র স্টাফ নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এরপর থেকে হাসপাতালে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় কেবল ‘নার্সরা’ দায়ী কিনা এ নিয়ে সচেতন মহলে ফের আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে।
গতকাল রোববার (১১ জানুয়ারি) নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ স্বাক্ষরিত পৃথক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নার্সরা হলেন-নার্সিং সুপারভাইজার কল্পনা রানী মন্ডল ও সিনিয়র স্টাফ নার্স রানী বালা হালদার।
হাসপাতালের একাধিক সেবাগ্রহীতা বলেন, এ ঘটনায় হাসপাতালে কর্মরত আরও কয়েকজন নার্স ও চিকিৎসকের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকলেও শুধুমাত্র আলোচিত ভিডিওতে দৃশ্যমান হওয়া দুইজন নার্সরে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করায় নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মিনহাজুল ইসলাম নামে এক সেবাগ্রহীতা বলেন, দুই বছর ধরে স্পর্শকাতর এমন একটি জায়গায় অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা চললেও কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করে ছিলেন। সর্বশেষ গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদের পর এখন শুধুমাত্র ছবি দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ কাণ্ডে নার্সদের পাশাপাশি স্বয়ং গাইনি বিভাগের চিকিৎসকরাও জড়িত। কিন্তু এখন এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে, ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়লেই অপরাধ, আর ফ্রেমের বাইরে থাকলে দায়মুক্তি। এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। এমন দায়সারা কাণ্ডে এখন কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রকৃত প্রতিবেদন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফাতেমা আক্তার নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, দীর্ঘ দুই বছর ধরে ওটির ভেতরে রান্না চলছে। এটি শুধুমাত্র নার্সের দায় হতে পারে না। এখানে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারেন না। শুধুমাত্র ভিডিওতে দেখা গেছে বলে তারা দুইজন শাস্তি পাবেন, অন্যরা বেঁচে যাবেন এমনটি কাম্য নয়। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় সম্পৃক্ত সকলের শাস্তির দাবি করছি।
এ ব্যাপারে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে বলেন, ইতোমধ্যে দুইজনের সাময়িক বরখাস্তের আদেশের কপি পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে গ্যাসের চুলায় রান্নাবান্না, অবাধ যাতায়াত এবং শৃঙ্খলাহীনতার কারণে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের সংক্রমণের উচ্চঝুঁকি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ‘সরেজমিনে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল: ওটিতে রান্নাবান্না, সংক্রমণের ঝুঁকিতে প্রসূতিরা’ শিরোনামে দৈনিক ফেনীতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
আদেশে যা বলা হয়েছে
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রান্নাঘর স্থাপনসহ নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ঘটনায় দুই সিনিয়র স্টাফ নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ নিয়ে আদেশে উল্লেখ করা হয়, ২৫০ শয্যা ফেনী জেনারেল হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে অপারেশন থিয়েটারের অভ্যন্তরে গ্যাসের চুলায় রান্না করার মতো চরম দায়িত্বহীন, শৃঙ্খলাবিরোধী ও অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক ফেনীতে সংবাদ আকারে প্রকাশিত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য, রোগীর নিরাপত্তা ও নার্সিং পেশার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়। এমন কর্মকাণ্ড হাসপাতালের সংবেদনশীল অপারেশন থিয়েটারের পরিবেশ, রোগীর নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও নার্সিং পেশার পেশাগত মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, তারা ২৫০ শয্যা ফেনী জেনারেল হাসপাতালে স্থানীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবা তত্ত্বাবধায়ক ও সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে অপারেশন থিয়েটারের সার্বিক শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও পেশাগত মান রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও এই অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর তদারকি, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হন। তাদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবে কাম্য নয়। এই ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী গুরুতর অসদাচরণ। এজন্য সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩ (খ) বিধির আলোকে উক্ত বিধিমালার বিধি ১২(১) অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজুকরণের স্বার্থে এবং এই মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আদেশ জারির তারিখ হতে কল্পনা রানী মন্ডল ও রানী বালা হালদারকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
তবে বিধি মোতাবেক তারা খোরপোষ ভাতা প্রাপ্ত হবেন বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
