১৯৯৯ সালে দুলাল ভাইয়ের বিয়ের দিন। আমরা সকাল ১১টার দিকে ফেনী থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে বরযাত্রা করি। কিন্তু পথিমধ্যে বারবকুণ্ড ও সীতাকুণ্ড এলাকায় পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পাটকল শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। চারদিকে অচলাবস্থা। বরযাত্রার সবার দুশ্চিন্তাÑকখন গন্তব্যে পৌঁছাবো, আদৌ বিয়ে হবে তো?

কিন্তু দুলাল ভাই যেন অন্য মানুষ। বরের পোশাক খুলে তিনি নেমে পড়লেন সাংবাদিকতায়। শ্রমিকদের দাবি, অবরোধের কারণ ও পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে লাগলেন। পত্রিকা অফিসে খবর পাঠাতে থাকলেন। সেদিন চট্টগ্রাম তাঁর দায়িত্বের কর্মক্ষেত্র ছিল না। তার ওপর ছিল নিজের বিয়ের দিন। তারপরও পেশাগত দায়িত্ববোধ তাঁকে থামাতে পারেনি।

অবরোধ প্রত্যাহারের পর সন্ধ্যার আগে আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছি। ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে রাতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফেনীতে ফিরি। কিন্তু সেদিন একজন নবীন সাংবাদিক হিসেবে আমি শিখেছিলামÑসাংবাদিকতা কারও কাছে শুধু পেশা নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা। আর দুলাল ভাই ছিলেন সেই দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

ওছমান হারুন মাহমুদ জনপদে দুলাল নামে পরিচিত। একজন নিরেট ভদ্রলোক চাপা স্বভাবের কথা বলতেন খুব কম। তবে ছিলেন একরোখা। তাঁর বাবা ডা. মেজর সিরাজুল ইসলাম ছিলেন ব্রিটিশ আর্মির প্রথম বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। সে সুবাদে ফেনী শহরের জিরো পয়েন্ট মোড়েই ছিল তাঁর বাবার নামের ‘সিরাজ ডিসপেনসারি’। যা ছিল শহরের প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন ওষুধের দোকান। সেই দোকানটিই ছিল ফেনীর মিডিয়া সেন্টার। সকল গণমাধ্যমকর্মীর আড্ডাস্থল। দুলাল ভাইয়ের কারণে সেই আড্ডায় যোগ দিতেন বাংলাদেশ এক্স-ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন (বেকা) এবং ফেনীর সাবেক বিএনসিসির কর্মকর্তা ও সদস্যরাও। ২০০২ সালে সড়ক প্রশস্ত করার প্রয়োজনে দোকানটি ভেঙে ফেলা হয়।

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে দুলাল ভাইয়ের দোকানের সেই আড্ডায় ফেনীর সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার পরিচয় ও ওঠাবসা শুরু। তিনি আমার প্রায় দশ বছরের সিনিয়র হলেও একসময় গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমিও তখন দৈনিক মুক্তকণ্ঠ ও একুশে টেলিভিশনে সাংবাদিকতার হাতেখড়ি নিয়েছি।

আমার দেখা ফেনীর সাংবাদিকতায় সাহস, দৃঢ়তা, সততা, সত্য ও ন্যায় লালনকারীদের সংখ্যা অতি নগণ্য। তাঁদের মধ্যে দুলাল ভাই ছিলেন অন্যতম। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে এ জনপদে যখন বন্দুকের নলের ডগায় সাংবাদিকতা হতো, তখন সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে আমাদের দুজনের গোপন ও কৌশলী সাংবাদিকতার পথচলা ছিল অনেক দিনের। একটু উনিশ-বিশ হলেই আমাদের মৃত্যু ছিল অবধারিত। আমার জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ সাংবাদিকতার একটি বড় অধ্যায় কেটেছে তাঁর সঙ্গে।

আমাদের পারিবারিক সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত গভীর। দুলাল ভাইয়ের কন্যা আমার স্ত্রীকে আজও ‘ছোট মা’ বলে ডাকে। ফেনী প্রেসক্লাবকে কেন্দ্র করে কিছুদিন দূরত্ব তৈরি হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর কণ্ঠনালিতে ক্যানসারের অপারেশন হয়। এরপর থেকে কথা বলতে পারতেন না। ইশারা-ইঙ্গিতে, কখনো কাগজে লিখে মনের কথা জানাতেন। তাঁর অবস্থার অবনতির খবর পেয়ে আমি চরম অসুস্থতা নিয়েও গত ২৩ মার্চ শেষবারের মতো তাঁর বাসায় যাই। অনেক কথার একপর্যায়ে তিনি লিখে জানালেন, কিছু মানুষের ভুল বোঝানোর কারণে তিনি একসময় আমার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন, পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং ক্ষমা চাইলেন। লেখাটি পড়ে আমার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। আমি তাঁর দুই হাত ধরে পরস্পরের কাছে ক্ষমা চাইলাম এবং কথা দিলাম, আমার জীবদ্দশায় তাঁর পরিবারের পাশে থাকব।

আজ (৯ জুন) ভোররাতে স্বপ্নে দেখলাম, আমরা কয়েকজন মিলে দুলাল ভাইকে কাফন পরিয়ে খাটিয়ায় তুলছি। ঠিক তখনই ভোর পৌনে ৫টায় ভাবির ফোনে ঘুম ভাঙল। জানলাম, দুলাল ভাই আর নেই। অসুস্থতার কারণে ছুটে যেতে পারিনি। তবে আমার স্ত্রী মুহূর্তেই তাঁর বাসায় চলে যায়। দুপুরে বাদ জোহর জানাজার নামাজ শেষে দুলাল ভাই চিরদিনের জন্য স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধা হয়ে গেলেন।

দুলাল ভাই দেশ, জাতি ও এ জনপদের মানুষের জন্য অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। নিয়ে গেছেন অগণিত মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দোয়া। দীর্ঘদিন দৈনিক জনকণ্ঠ ও এনটিভির ফেনী জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতাল গড়ে তোলার পেছনেও ছিল তাঁর অনন্য অবদান।

৬৭ বছর বয়সে তিনি এক ছেলে, এক মেয়ে, স্ত্রী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

মহান আল্লাহ তাঁর সকল গুনাহ মাফ করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। তাঁর পরিবারকে শোক সইবার শক্তি দান করুন। আমিন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক