মূল্যহীনতা, সংরক্ষণ সংকট ও ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহে আবারও নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় পড়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। গেল বছর দাম না পেয়ে সড়কে চামড়া ফেলে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একই পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবারও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রতি বছর কোরবানির ঈদ এলেই সামনে আসে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার সংকট। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা রাস্তায় চামড়া ফেলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যবসায়ী সংকটের কারণে কোরবানির পশুর তুলনায় চামড়া সংগ্রহও কমে গেছে। ফলে আসন্ন ঈদকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ফেনীতে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ, সংগ্রহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। কোরবানির পশুর চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানো ও লবণ প্রয়োগের পদ্ধতি বিষয়ে মৌসুমি কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী, মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দামহীনতা ও লোকসানের শঙ্কায় এ খাতে পর্যাপ্ত ব্যবসায়ী নেই। ফলে স্বল্প মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করেও সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে ট্যানারিতে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা একদিকে লোকসানে পড়ছেন, অন্যদিকে উপায় না পেয়ে সংগৃহীত চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে সম্ভাবনাময় এ শিল্প কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
গত শনিবার (২৩ মে) হেফাজতে ইসলামের আয়োজনে ফেনীতে ‘অস্তিত্ব সংকটে সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প রক্ষা ও বিকাশে সরকারের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে পরিবেশবান্ধব চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সরকারি প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় লবণ সরবরাহ ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি ওঠে।
সভায় বক্তারা বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
হেফাজতে ইসলাম ফেনী জেলার সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায় বা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। দেশের স্বার্থে আমরা চামড়া সংগ্রহ করব। তবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে সংরক্ষণ, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় সাড়ে ৮২ হাজার। সে হিসেবে প্রায় ৮০ হাজার চামড়া সংগ্রহের সম্ভাবনা থাকলেও স্থায়ী একজন ব্যবসায়ী সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ হাজার চামড়া সংগ্রহ করে ট্যানারিতে পাঠাতে পারেন। ফলে সংরক্ষণ করা না গেলে অধিকাংশ চামড়াই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মনিরা হক ইতোপূর্বে বলেন, চামড়া সংরক্ষণ ও লবণ প্রয়োগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে মাদরাসা ও এতিমখানা সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। চামড়ার দাম নির্ধারণে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে এবং সিন্ডিকেটের ব্যাপারে নজরদারি করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনতে হবে। সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি অস্থায়ী সংরক্ষণাগার তৈরির চেষ্টা করা হবে, যাতে লবণ বা সংরক্ষণের অভাবে কোনো চামড়া নষ্ট না হয়। এছাড়া পশুর হাটগুলোতে পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান জেলা প্রশাসক।
ফেনী পৌরসভার মেডিকেল অফিসার কৃত্তপদ সাহা জানান, গত বছর রাস্তার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৮ ট্রাক চামড়া অপসারণ করতে হয়েছে পৌরসভাকে। অনেকে চামড়া কিনে বিক্রি করতে না পেরে পরে সেগুলো রাস্তায় ফেলে যান। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি দুর্গন্ধ ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের চামড়া শিল্পও।
অন্যস্থলে সংরক্ষণাগারে অনাগ্রহ
জেলা প্রশাসন স্থানীয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ ও পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৌশলগত স্থানে অস্থায়ী সংরক্ষণাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেও চামড়া ব্যবসায়ীরা নিজেদের সংরক্ষণাগার ছাড়া অন্য কোথাও চামড়া সংরক্ষণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
একাধিক চামড়া ব্যবসায়ী জানান, পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ করা হলেও সঠিক প্রশিক্ষণ ও ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহের কারণে জেলার প্রত্যাশিত পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ হয় না। লোকসানের শঙ্কায় আগের মতো কেউ এ ব্যবসায় আসতে চান না।
নূর ট্রেডার্সের এক চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা অনেক সময় সম্ভব হয় না। কারণ চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণে অতিরিক্ত খরচ হয়। কিন্তু সেই অনুযায়ী ট্যানারি থেকে দাম পাওয়া যায় না। আগে অনেক বেশি ব্যবসায়ী থাকলেও এখন সংখ্যা কমে গেছে। ফলে সব চামড়া কেনা সম্ভব হয় না। লোকসানের ভয়ে অনেকে ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে চামড়া সংগ্রহ করে আনতে আনতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এর মধ্যে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হয়। এ বছর বৃষ্টির কারণে লবণের দামও বেশি। ট্যানারি থেকেও সময়মতো টাকা পাওয়া যায় না। ফলে জেলার বেশিরভাগ ব্যবসায়ী এখন আর এ খাতে আগ্রহী নন।
চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারিভাবে লবণ সরবরাহ করা হলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় ব্যবসার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। আগে যেখানে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সক্রিয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ করতেন, এখন লোকসানের কারণে অনেকে এ খাত ছেড়ে দিয়েছেন। এমনকি অনেক মাদরাসা ও এতিমখানাও আগের মতো চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
মোস্তফা জব্বার নামে এক মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর চামড়া সংগ্রহ করি। কিন্তু প্রায় প্রতি বছরই লোকসানে পড়তে হয়। যে দামে চামড়া কিনে শহরে নিয়ে আসি, সে দামে বিক্রি করতে পারি না। প্রশিক্ষণ না থাকায় ঠিকভাবে সংরক্ষণও করতে পারি না। প্রশাসন থেকে প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও আমরা কখনো তা পাইনি, বিনামূল্যে লবণও পাইনি। ফলে বিক্রি করতে না পারলে রাস্তায় ফেলে চলে আসতে হয়।
মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানের খরচ চালানোর জন্য প্রতিবছর চামড়া সংগ্রহ করা হলেও পরিবহন খরচের তুলনায় দাম পাওয়া যায় না। এজন্য অনেক মাদরাসা এখন আর চামড়া সংগ্রহ করে।
