ফেনীর ওয়ান স্টপস মেটারনিটি ক্লিনিকে ‘অপচিকিৎসার’ শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের শিবপুর এলাকার গৃহবধূ লিজা। এ ঘটনায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত কমিটির তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও চিকিৎসায় গাফেলতির প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ফেনী জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থিসিয়া) ডা. মো. আবদুল্যাহ আব্বাসী দৈনিক ফেনীকে বলেন, তদন্তে গাইনী চিকিৎসক নাসরীন আক্তার মুক্তার গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার কারণেই প্রসূতির অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তিনি যথাসময়ে রোগীকে ফলোআপ করলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত।
তদন্তে প্রতিবেদন বলা হয়েছে, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অর্থাৎ পোস্টপার্টাম হেমোরেজ হয়েই তার মৃত্যু হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর রক্তক্ষরণ শুরু হলে নার্সরা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দেননি। ক্লিনিকটিতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চিকিৎসকরা থাকতেন। বাকি সময় প্রতিষ্ঠানটি চালাতেন সেকমোরা (সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার)। জরুরি পরিস্থিতিতে এটি বড় ধরনের ঝুঁকি।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে এটিকে চিকিৎসায় গুরুতর গাফিলতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তদন্তে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি ছিল। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ছনুয়া ও মোটবী ইউনিয়নের দুই পরিবার পরিকল্পনা কর্মী—গীতা রানী দাসসহ অপর একজন রোগীকে সরকারি হাসপাতালে না পাঠিয়ে সরাসরি ওই ক্লিনিকে নিয়ে আসেন, যা নীতি বিরোধী। তাদের বিরুদ্ধে রোগীদের আল্ট্রাসাউন্ড ও অ্যান্টিবায়োটিক পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ মিলেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোগীর শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার পর তাকে অন্য ক্লিনিকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা হয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ক্লিনিকটির লাইসেন্স, অপারেশন থিয়েটারের মান এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততা রয়েছে।
শাস্তি নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থা সংস্কারের সুপারিশ করল কমিটি
স্বাস্থ্য বিভাগীয় তদন্তে অপচিকিৎসায় লিজার মৃত্যুর কারণ সুস্পষ্ট হলেও প্রতিবেদনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়নি, বরং চিকিৎসা ব্যবস্থা সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. মো. আবদুল্যাহ আব্বাসী বলেন, আমরা সরাসরি শাস্তির সুপারিশ করিনি; বরং পুরো ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে দালালের মাধ্যমে রোগী আনা, পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের চিকিৎসা পরামর্শ-এসব বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসায় গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশসহ তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে লিজার মৃত্যুর ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসন। তবে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখন জমা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ.কে.এম. ফয়সাল। তিনি জানান, শুনানি শেষ হয়েছে, শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত ১০ এপ্রিল নাঈমা আক্তার লিজা প্রসব ব্যথা নিয়ে ফেনী ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকে ভর্তি হন। রাতে তার অপারেশন হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরদিন সকালে নবজাতক রেখে লিজাকে ‘ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালে’ পাঠায় ওয়ান স্টোপস কর্তৃপক্ষ। সেখানে চার ঘণ্টা অপারেশন থিয়েটারে রেখে বিকেলে চট্টগ্রামে পাঠান তারা। চট্টগ্রামে নেওয়ার পথে গাড়িতেই মৃত্যু হয় লিজার। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় তিন চিকিৎসকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন লিজার বাবা মোহাম্মদ নুর করিম। লিজার মৃত্যুর ঘটনায় ফেনীতে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ফের প্রশ্ন ওঠে। এ ঘটনায় ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক ও ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালসহ ৪টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে প্রশাসন।
