একটি প্রতিশ্রুতি-হাজারো মানুষের করতালি, উচ্ছ্বাস আর স্বপ্নে ভরপুর একটি বিকেল। ফেনী কলেজ মাঠে তখন মানুষের ঢল, লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে উচ্চারিত হয়েছিল একটি প্রত্যাশার কথা—ফেনী জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কষ্ট আর প্রয়োজনের জমাটবাঁধা অভিব্যক্তি। মানুষ বিশ্বাস করেছিল—এবার হয়তো পরিবর্তন আসবে, এবার হয়তো চিকিৎসার জন্য আর দূর শহরে ছুটতে হবে না।

কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই আশাবাদ ধীরে ধীরে প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। ১ এপ্রিল ২০২৬, জাতীয় সংসদ-এর অধিবেশনে যখন বিষয়টি উত্থাপিত হলো, তখন অনেকেই ভেবেছিল—এবার প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। স্বাস্থ্য মন্ত্রী জানাল, দেশের আটটি জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে, তবে ফেনী সেই তালিকায় নেই। পরবর্তীতে কণ্ঠভোটে সেই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। একটি প্রতিশ্রুতির বিপরীতে এমন সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে হতাশা, বিস্ময় এবং প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রশ্নটা শুধু একটি মেডিকেল কলেজের নয়-এটি প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাস ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানের প্রশ্ন।

ফেনীকে যদি কেবল একটি ছোট জেলা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্ত হয়তো যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ফেনীর নিজস্ব জনসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ হলেও, প্রতিদিন সেনবাগ ও কোম্পানিগঞ্জ (নোয়াখালী), মিরসরাই (চট্টগ্রাম), চৌদ্দগ্রাম ও লাকসাম (কুমিল্লা), এমনকি খাগড়াছড়ি-এর একাংশের মানুষও শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য ফেনীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে কার্যত আরও প্রায় ১৬ লাখ মানুষের চাপ এই জেলার ওপর পড়ে। অর্থাৎ, ফেনী একটি প্রশাসনিক ইউনিটের চেয়েও অনেক বড়—এটি একটি আঞ্চলিক সেবা কেন্দ্র, একটি জীবন্ত সংযোগস্থল।

এই “ফাংশনাল বাস্তবতা” উপেক্ষা করেই যদি উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়, তাহলে তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ বা কার্যকর হতে পারে না। একটি জেলার গুরুত্ব নির্ধারণে শুধু তার আয়তন বা স্থায়ী জনসংখ্যা নয়, বরং তার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা এবং সেবার চাহিদা বিবেচনা করা জরুরি। সেই বিবেচনায় ফেনী আজ প্রায় ৩০ লাখ মানুষের একটি কেন্দ্রবিন্দু।

বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফেনীর মানুষকে ছুটতে হয় চট্টগ্রাম বা ঢাকা-এর দিকে। এতে সময় ও অর্থের অপচয় তো হয়ই, অনেক ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসার অভাবে জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকলে এই চাপ অনেকাংশে কমে আসত এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।

ফেনীতে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা মানে কেবল একটি ভবন নির্মাণ নয়; এটি হবে একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা। এটি চিকিৎসা শিক্ষা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আজ ফেনীর মানুষের প্রশ্ন খুবই সরল—যেখানে প্রয়োজন এতটা স্পষ্ট, সেখানে সিদ্ধান্ত ভিন্ন হলো কেন? একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কি শুধুই মুহূর্তের আবেগ, নাকি তা বাস্তবায়নের দায়ও বহন করে?

উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ফেনীর বাস্তবতা সেই প্রয়োজনেরই প্রতিফলন। এখন সময় এসেছে ফেনীকে নতুন করে দেখার—একটি ছোট জেলা হিসেবে নয়, বরং একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই একটাই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ফেনীতে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, এটি সময়ের অনিবার্য দাবি।

লেখক 

সাইদুল ইসলাম 

সাধারন সম্পাদক 

ফেনী জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়ন পরিষদ