ফেনী শহরের ট্রাংক রোড থেকে পায়ে হেঁটে এসএসকে রোড এলাকায় ফুটপাত দিয়ে মায়ের হাত ধরে বাসায় যাচ্ছিল ৮ বছরের শিশু রাফি। হঠাৎ করেই ফুটপাতের ভাঙা স্ল্যাবের ফাঁকে তার পা আটকে যায়। ব্যথায় চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। আশপাশের লোকজন দ্রুত ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে।

ঘটনার পর ঘটনাস্থলে থাকা দৈনিক ফেনীর প্রতিবেদক কথা বলেন রাফির মায়ের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বাসা ডাক্তার পাড়ায়। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়েই আমরা যাতায়াত করি। ফুটপাতগুলো এতটাই ভাঙা যে বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটাই দায়। আজ আমার ছেলের পা আটকে গেছে, কাল হয়তো আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটবে। কিন্তু পৌরসভা যেন দেখেও দেখছে না।

রাফির মায়ের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিবেদক গতকাল শনিবার (২৮ মার্চ) সরেজমিনে ট্রাংক রোড থেকে শহিদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক হয়ে ডাক্তার পাড়া পর্যন্ত পুরো এলাকা ঘুরে দেখেন। এতে দেখা যায়, পুরো সড়ক জুড়েই ফুটপাতগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ।

একাধিক স্থানে ফুটপাতের স্ল্যাব সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে আছে, কোথাও আবার স্ল্যাব সরে গিয়ে বড় বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে এসব স্ল্যাব ক্ষয়ে গিয়ে অনেক জায়গায় গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তের ভেতর থেকে লোহার রড বের হয়ে থাকতে দেখা যায়, যা যেকোনো সময় পথচারীদের জন্য গুরুতর দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

শহিদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতের এই বেহাল অবস্থার কারণে তারা চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। ভাঙাচোরা ফুটপাতের কারণে ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না, ফলে ব্যবসায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তারা জানান, ফুটপাতের স্ল্যাব ভেঙে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় অনেক সময় ক্রেতারা হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এবং রাতে অপ্রতুল আলোর কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

তারা আরও বলেন, ফুটপাতের বিভিন্ন স্থানে স্ল্যাব ভেঙে লোহার রড বের হয়ে আছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ছোট শিশু বা বয়স্ক কেউ অসাবধানতাবশত পড়ে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এরই মধ্যে কয়েকজন পথচারী আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তারা নিজেরা ভাঙা ফুটপাতের স্ল্যাব সরিয়ে বাঁশ ও কাঠ ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে চলাচলের পথ তৈরি করছেন কিন্তু সেটিও বেশিদিন টিকে না।

এসএসকে রোডের নুর মোহাম্মদ নামে এক ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, আমাদেরকে বলা হয়েছিল ঈদের পরে দোকানের সামনে ভাঙা স্ল্যাব সরিয়ে নতুন স্ল্যাব বসানো হবে, কিন্তু এখনো সেটি করা হয়নি। এর ফলে ক্রেতাদের আসা-যাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে।

একই রোডে এক স্যানেটারি দোকানের কর্মচারী রাজু জানান, গতকাল আমি নিজেই ভাঙা স্ল্যাবের কারণে পড়ে গিয়েছি। ফুটপাতের এই ভাঙা স্ল্যাবগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এটি অনতিবিলম্বে সংস্কার করা জরুরি।

ইসলামপুর রোডের দরজা ব্যবসায়ী ছাব্বির বলেন, কিছুদিন আগে দেখলাম ড্রেনের মাপজোখ নেওয়া হয়েছে। ঈদের পরে কাজ শুরু হবে শুনেছি। কিন্তু এখনও কোনো কাজ শুরু হয়নি। ভাঙা স্ল্যাবগুলো এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে আমরা নিজেই কাঠ বা বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে পথ তৈরি করেছি। কিন্তু সেটিও বেশিদিন টিকে থাকে না। ফলে পথচারীদের জন্য ঝুঁকি একইভাবে রয়ে গেছে।

২৭ কোটি টাকার ড্রেনেজ প্রকল্পে ‘স্থবিরতা’

ফেনী শহরের ট্রাংক রোড থেকে এসএসকে রোড হয়ে ডাক্তার পাড়া পর্যন্ত ফুটপাতের নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে একটি স্থবির উন্নয়ন প্রকল্পের চিত্র। প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৬ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ (স্ল্যাবসহ) প্রকল্পটি তিন মাস আগে কার্যাদেশ পেলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

ফেনী পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘প্যারট ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড (পিডিএল)’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তবে কার্যাদেশ পাওয়ার তিন মাস পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেনি।

সূত্রে আরও জানা গেছে, কাজ শুরু না করায় প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। বিষয়টি পরে প্রকল্প অফিসকে জানানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ফেনী পৌর প্রশাসক মো. নবীনেওয়াজ বলেন, এটি নিয়ে আমরাও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। প্রজেক্ট এক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া থাকলে অন্য জায়গায় সে প্রজেক্টের কাজ করা যায় না। তিনি আরও বলেন, তিন মাস আগে এ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, তারা কাজটি করছে না। ইতিমধ্যে আমাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকল্প অফিসকে জানানো হয়েছে।

‘বাধ্য’ হয়ে রাস্তায় পথচারী

ফেনী শহরের ট্রাংক রোড থেকে এসএসকে রোড হয়ে ডাক্তার পাড়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের বেহাল অবস্থার কারণে পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়ক ব্যবহার করছেন। ভাঙা স্ল্যাব, বড় ফাঁকা গর্ত এবং বের হয়ে থাকা লোহার রডের কারণে ফুটপাত এখন অনেকের কাছেই আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত ফুটপাত ব্যবহার না করে নারী, শিশু ও বয়স্কসহ বেশিরভাগ পথচারীই মূল সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।

পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার চেয়ে সড়কে হাঁটাই তাদের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ মনে হচ্ছে। অনেকেই জানান, হঠাৎ পা ফাঁকে আটকে যাওয়া বা হোঁচট খাওয়ার ভয় সবসময়ই কাজ করে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে চলাচল করা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তানজিম হাসান নামে এক অভিভাবক বলেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গেলে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে বাচ্চাদের নিয়ে রাস্তায় নেমে হাঁটছি, যদিও সেটা নিরাপদ না।

মোস্তাকিম সিফাত নামে এক পথচারী বলেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার চেয়ে এখন সড়ক দিয়ে হাঁটাই আমাদের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ মনে হয়। কারণ ফুটপাতের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, কখন কোথায় পা পড়ে যাবে বা হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবো-এই ভয় সবসময় কাজ করে। অনেক জায়গায় স্ল্যাব ভেঙে বড় বড় ফাঁকা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও ড্রেনের ঢাকনা নেই বা সরে গেছে। অসাবধানতাবশত পা পিছলে গেলে সরাসরি ড্রেনে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এদিকে সিএনজি, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চালকরাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, হঠাৎ করে পথচারীরা সড়কে উঠে আসায় যানবাহন চালাতে গিয়ে তারা প্রায়ই বিপাকে পড়ছেন। এতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বাড়ছে বলে তারা জানান।

মাসুদ রানা নামে এক সিএনজি চালক বলেন, ট্রাংক রোড থেকে এসএসকে রোড পর্যন্ত সারাদিনই জ্যাম লেগে থাকে। তার ওপর ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে আসছেন, ফলে যানজট বাড়ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে গেছে। আমরা চালকরাও স্বস্তিতে গাড়ি চালাতে পারছি না।

সবুজ মিয়া নামে এক রিকশাচালক বলেন, ফুটপাত ভাঙা হওয়ার কারণে পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে আসেন। তখন আমরা রিকশা চালাতে গেলে অনেক সময় তাদের সঙ্গে গায়ে লেগে যায়, আর এতে তাদের সঙ্গে ঝামেলা সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে ফেনী জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (টিআই) এস.এম শওকত বলেন, পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার না করে সড়কে নেমে চলাচল করলে যানজট সৃষ্টি হয় এবং এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত যানজট নিরসন ও সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে। পথচারীদের মূল সড়কে না নেমে নিরাপদে ফুটপাত ব্যবহার করে চলাচল করতে হবে।