নিম্নবিত্ত মানুষের ঈদ বাজারে সরগরম হয়ে উঠেছে ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্র ট্রাংক রোডসংলগ্ন রাজাঝির দিঘির পাড়। প্রতি বছরের মতো এবারও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছে এ অস্থায়ী বাজার। প্লাস্টিক, চট ও বাঁশের তৈরি ছোট ছোট দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। রিকশাচালক থেকে শুরু করে দিনমজুর, এমনকি শহরের নিম্নবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের ঈদের কেনাকাটার অন্যতম ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে এই বাজার। শুধু ঈদ এলেই নয়, সারাবছরই সরগরম থাকে ভ্রাম্যমাণ এ মার্কেটটি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের ঈদের তুলনায় এবার বেচাকেনা কিছুটা ভালো। তবে রমজানের শেষ মুহূর্তে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে স্বল্পমূল্যে কেনাকাটা করতে পেরে খুশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।ঈদ উৎসব সবার জন্য হলেও নিম্নবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কেনাকাটা সবসময়ই চিন্তার বিষয়। বড় বিপণিবিতান কিংবা ব্র্যান্ডের শোরুম তাদের সাধ্যের বাইরে থাকায় রাজাঝির দিঘির পাড়ের এই ঈদ বাজার হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ভরসা।

মঙ্গলবার (১১ মার্চ) সন্ধ্যায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বড় বড় বিপণিবিতান কিংবা ব্র্যান্ডের শোরুমের তুলনায় কম দামে শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক, জুতা, কসমেটিকসসহ নানা পণ্য পাওয়া যাচ্ছে এ বাজারে। পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যেই ভালো মানের পোশাক কেনা সম্ভব হচ্ছে। শিশুদের পোশাক ১৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে মিলছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির।

বাজারটি অবৈধভাবে দিঘির পাড় দখল করে গড়ে উঠলেও এটিকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, প্রায় দুই থেকে তিন হাজার মানুষ এ বাজারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তারা এখানে ব্যবসা পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্থানীয় অনেকেই এই বাজারকে তাদের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন।

তবে অবৈধ হওয়ায় এটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনাও রয়েছে। এই ভাসমান বাজারে প্রায় ৭ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের স্ত্রীদের নামে রয়েছে আশা, ব্র্যাক, ব্যুরো বাংলা ও স্থানীয় ঋণদানকারী এনজিওর ঋণ।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী জানান, প্রায় ৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি ব্যবসা শুরু করেছেন। তবে এখনও মূলধন পুরোপুরি ফিরে পাননি। ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতাদের জন্য নতুন জামা-কাপড় তুললেও বিক্রি আশানুরূপ হয়নি। তবে তিনি আশাবাদী, রমজানের শেষ দিকে বিশেষ করে ঈদের আগের দিনগুলোতে বেচাকেনা বাড়বে।

আশরাফুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, আমি রাজাঝির দিঘির পাড়ে প্রায় তিন বছর আগে এই ব্যবসা শুরু করেছি। অনেক বাধা এসেছে, তবে শক্তভাবে টিকে আছি। ব্যবসাটি ভালোভাবে দাঁড় করাতে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। এখানে ব্যবসা অনেকটা মৌসুমি ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে ঈদের সময় কিছুটা ভালো বিক্রি হয়, তখন কিছু লাভের মুখ দেখা যায়। এ ঈদে এখন পর্যন্ত মোটামুটি ভালো বেচাকেনা হয়েছে। তবে ঈদের দুই-এক দিন আগে ক্রেতা আরও বাড়বে।

রহমত আলী নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকি,কখন প্রশাসন এসে আমাদের ব্যবসা উচ্ছেদ করে দেয়। কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এ ব্যবসা শুরু করেছি, কিন্তু সারা বছর তেমন বিক্রি হয় না। ঈদের সময়ই একটু ভালো বিক্রির সুযোগ পাই। আজ সকাল থেকে প্রায় ১১ হাজার টাকার বিক্রি করেছি। আশা করছি ঈদের আগের দিনগুলোতে বিক্রি আরও বাড়বে।

তবে কিছু ব্যবসায়ী বিক্রি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। তাদের ভাষ্যমতে, ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পুঁজি দিলেও এখন পর্যন্ত সে টাকা উঠে আসেনি। তবে তারা আশা প্রকাশ করেন রমজানের শেষ দশদিনে বেচাবিক্রি অনেকটাই বাড়বে।

সজীব নামে এক বিক্রেতা বলেন, এবার জামা কাপড়ের দাম অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। মানুষ কেনাকাটা করছে, তবে আমাদের এখানে বেশিরভাগ ক্রেতা জেলার বাইরের লোকজন। রিকশাচালক ও দিনমজুররা শেষ দিকে কেনাকাটা করে, আশা করছি শেষ দিকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।

পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন দিনমজুর আবু বক্কর। বড় মার্কেটের দামী পোশাক তার সাধ্যের বাইরে থাকায় রাজাঝির দিঘির পাড়ের এই বাজার থেকেই স্বল্পমূল্যে পরিবারের সবার জন্য পোশাক কেনার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, বাচ্চাদের জন্য নতুন জামা কিনতে পেরে ভালো লাগছে। বড় মার্কেটগুলোতে গেলে অনেক খরচ হতো, কিন্তু এখানে কম দামে মোটামুটি ভালো জিনিস পাচ্ছি।

নিজের মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন রিকশাচালক আব্বাস উদ্দিন। তিনি বলেন, আমার পরিবার খুলনায় থাকে। ঈদের কয়েকদিন আগে বাড়িতে যাব, তাই সবার জন্য কেনাকাটা করতে এসেছি। এখানে কম দামে পণ্য পাওয়া যায়, তাই সবার মতো আমিও এসেছি। আমার আয় অনুযায়ী এখান থেকে সুলভ মূল্যে কেনাকাটা করা সম্ভব।

তবে শহরের বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, এ জায়গাটি মূলত ব্যবসার জন্য নয়, এটি শহরের সৌন্দর্যের অংশ। দিঘির পাড়কে এভাবে দখল করে ব্যবসা করার সমালোচনা করেছেন অনেকে। দিঘির পাড়ের ব্যবসায়ীদের অন্যত্র পুনর্বাসন করে শহরের সৌন্দর্য রক্ষার্থে এ স্থানটি উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।