ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ ভারতীয় সিম কার্ড ব্যবহারের বিষয়টি প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল এবং ভিজিলেন্স ও অবজারভেশন টিমের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।

সভায় আরও যেসব চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়, তার মধ্যে রয়েছে—বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি, রেললাইনে নাশকতার আশঙ্কা, সীমান্তবর্তী এলাকায় দেশীয় মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ক স্বল্পতা এবং সম্ভাব্য নাশকতামূলক কার্যক্রম।

ফেনীর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হকের সভাপতিত্বে সভায় পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম, বিজিবির ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, সেনাবাহিনী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

 

প্রসঙ্গত, গত ৬ জানুয়ারি ‘ফেনী সীমান্তে “ভয়ঙ্কর” ভারতীয় মোবাইলফোন নেটওয়ার্ক’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে সীমান্তবর্তী জেলা ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে ভারতীয় বিভিন্ন মোবাইলফোন কোম্পানির সিমকার্ড ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে।

নিরপেক্ষতার প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে থাকবে ইসি- নির্বাচন কমিশনার

নির্বাচনে ভোটগ্রহণ সংশ্লিষ্টদের কারো পক্ষপাতিত্ব প্রমাণিত হলে পরিণতি খুব খারাপ হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।

গতকাল মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল এবং ভিজিলেন্স ও অবজারভেশন টিমের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আমরা সামান্যতম কোন বিচ্যুতি গ্রহণ করব না। এর কারণ অতীতে যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে, সেটির মূল কারণ ছিল নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার অভাব। এজন্য একসুতো পরিমাণ কোন পক্ষপাতিত্ব আমরা মেনে নেব না।

আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে পক্ষপাতিত্বমূলক কোন নির্দেশনা কখনোই দেওয়া হবে না। তারপরও কেউ যদি নিজের পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারেন, পক্ষপাতিত্ব বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে কিন্তু পরিণতি খুব খারাপ হবে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত শক্ত থাকবে।

এই নির্বাচনে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনার নির্বাচন নয়। এটির সঙ্গে দেশীয় ভাবমূর্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও জড়িত। এ নির্বাচন দীর্ঘ খরার পর বৃষ্টির মতো। এবার প্রথমবার পোস্টাল ব্যালট কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছি। তথ্য-প্রযুক্তির যুগেও এটি প্রথম নির্বাচন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনেও তথ্য প্রযুক্তির এমন পরিবর্তন ছিল না।

ইসি বলেন, আমাদের প্রথম প্রত্যাশা ছিল মাঠ পর্যায়ে সকলের ঐক্যবদ্ধতা। এটির মাধ্যমেই সুন্দর, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব। যেটি ফেনী জেলায় এখন পর্যন্ত রয়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার আচরণবিধি মেনে চলার মনোভাব বেড়েছে। এটি আমাদের কাজকে সহজ করেছে। এ নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের সুযোগ নেই। নির্বাচনে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা থাকতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশ্যে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হলো মানুষ নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তার পছন্দের প্রার্থীকে যেন ভোট দিতে পারে। এর ব্যত্যয় যেন না ঘটে। নির্বাচন ভালো হওয়ার পূর্বশর্ত ভালো আইনশৃঙ্খলা। এজন্য সকলের সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। আমরা যা কিছু হারিয়ে ফেলেছি সেগুলো পুনরুদ্ধারে সকলের ঐক্যবদ্ধতার বিকল্প নেই।

অবৈধ সিম কার্ড সীমান্তে অপরাধ দমনে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা- অধিনায়ক, ফেনী ব্যাটালিয়ন

সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ ভারতীয় সিম কার্ড ব্যবহারের বিষয়ে বিজিবির ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন দৈনিক ফেনীকে বলেন, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ সিম কার্ডের ব্যবহার শুধু নির্বাচনের সময়ই চ্যালেঞ্জ নয়, বরং চোরাচালান দমন ও অন্যান্য অপারেশন পরিচালনার ক্ষেত্রেও এটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসসকে অবহিত করা হয়েছে। এটি একটি জাতীয় ইস্যু এবং আশা করা হচ্ছে এর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফেনী ব্যাটালিয়নের অধীন ১০২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকাকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে ফেনী-১ আসনের তিনটি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আগামী ৩১ জানুয়ারি থেকে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, জেলার অন্যান্য উপজেলায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ২ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। আসন্ন নির্বাচনে বিজিবি পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবে।

পক্ষপাতমুক্ত পুলিশি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছি-পুলিশ সুপার

ফেনীর মাটিতে পক্ষপাতমুক্ত পুলিশি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কাজ করছি বলে মন্তব্য করেছেন ফেনীর পুলিশ সুপার শফিকুল ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল এবং ভিজিলেন্স ও অবজারভেশন টিমের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় তিনি এমন মন্তব্য করেন।

পুলিশ সুপার বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। প্রার্থীরা যেসব এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় যাচ্ছেন, সেসব এলাকা আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচনে ফেনীতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন—সে লক্ষ্যেই পুলিশের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।