মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন ফেনীর সাধারণ ভোক্তারা। আয় না বাড়লেও বাজারে দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে সবজির বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতিতে ভোক্তার নাভিশ^াস উঠেছে। প্রতি বছরই বর্ষা শেষে শরৎ এলেই অলিখিতভাবেই বেড়ে যায় সবজির দাম। তবে এর ভিন্ন চিত্র শুধু আলুর ক্ষেত্রে। ফেনীর বাজারে আলুই এখন একমাত্র সবজি, যা মিলছে তুলনামূলকভাবে কম দামে। ক্রেতারা বলছেন, বাজারে প্রতিটি সবজির দাম বেড়েছে দুই থেকে তিন গুণ। এতে দৈনন্দিন খাদ্যের যোগানে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে ব্যবসায়ী বলছেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কম থাকায় দাম বেশি। দাম স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে আরও এক মাস।

ফেনী শহরের মিজান রোড এলাকার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক নুসরাত জাহান। তার নিজের আয়ে চলে তিন সদস্যের সংসার। দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার মাসিক আয় ২২ হাজার টাকা। আগে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় মাসের বাজার হয়ে যেত। এখন ১২ হাজারের বেশি লাগছে, অথচ বেতন বাড়েনি। বাজারে কেবল আলুই এখন কিছুটা সাশ্রয়ী।

শহরের সুলতান মাহমুদ পৌর হকার্স মার্কেট ও বড় বাজারে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি সবজিতে গত মাসের তুলনায় কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। বাজারে টমেটো বিক্রি হচ্ছে কেজি ১২০-১৩০ টাকায়, মূলা ৫০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, খিরা ৬০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, সসিন্দা ৬০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, বেগুন ৯০ টাকা, গাজর ১৪০-১৬০ টাকা, ঝিঙা ৮০-১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি পেঁয়াজ মিলছে ৮০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে আলুর দাম অনেকটা স্থিতিশীল। সাদা আলু ২০-২২ টাকা ও লাল আলু ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের ঝুড়িতে সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করছে আলুই।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে আটাশ চাল ৬২ টাকা, মিনিকেট চাল ৮০ টাকা, আটা ৪৭ টাকা, ময়দা ৭০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৮৭ টাকা লিটার, মসুরের ডাল ১০০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৮০ টাকা, রসুন ১২০ টাকা, চিনি ১০৫ টাকা, হলুদ ২২০ টাকা, এলসি আদা ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি ১৫৫ টাকা, লাল মুরগি ৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বড় বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. নুরুল ইসলাম জানান, বৃষ্টি আর পরিবহনের ঝামেলায় সরবরাহ কমেছে। পাইকারি বাজারেই দাম বেশি। আমরা কমে বিক্রি করব কীভাবে? তবে আলুর দাম সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে, সেজন্যই দাম কম।
আবদুল খালেক নামে আরেক বিক্রেতা বলেন, পেঁয়াজ, টমেটো, মরিচের যোগান কম। গাজর বা টমেটো আসছে অন্য জেলা থেকে। তাই খরচও বেশি। ক্রেতারা গালাগালি করেন, কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। গত এক সপ্তাহ ধরেই সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। এখন ধীরে ধীরে কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

বাজার করতে আসা রিকশাচালক আবদুল কাদের বলেন, দিনে আয় করি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। আগে অর্ধেক টাকা বাজারে খরচ হতো, এখন পুরো টাকাই বাজারে চলে যায়। ডাল, মাছ, মাংস তো স্বপ্ন, সবজি দিয়েই কোনো রকম সংসার চলছে। কিছুদিন আগেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। এখন বাজারে সবকিছুর দামে আগুন। আমাদের মত দিনমজুরদের জন্য এটি বেশ কষ্টসাধ্য।
নাজির রোড এলাকার গৃহিনী সানজানা আক্তার বলেন, সবজি কিনতে গেলে আলু ছাড়া আর কিছু নেওয়া যায় না। আগে সপ্তাহে তিন-চার রকম সবজি কিনতাম, এখন সবকিছুই যেন নাগালের বাইরে।
দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী পৌর তরকারি আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবু জাফর বলেন, বৃষ্টির কারণে সবজির দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। এখন রোদ ওঠায় গত কয়েকদিনের তুলনায় দাম কিছুটা কমেছে। আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে বর্ষার কারণে সবজির দামে কিছুটা প্রভাব পড়ে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সব ধরনের সবজি নাগালের মধ্যে চলে আসবে।

ফেনী জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আসাদুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং চলছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা মরিচের বাজ্রা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি চলছে। কেউ অন্যায়ভাবে দাম বেশি রাখলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সবজির দাম সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। প্রতিবছর এই সময়ে সবজির দাম কিছুটা বাড়তি থাকে, কারণ আবহাওয়াজনিত কারণে সবজির সরবরাহ কিছুটা কমে যায়।
এ ব্যাপারে ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্ল্যাহ বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে গ্রীষ্মের শেষ দিকে কৃষকরা সবজি আবাদে আগ্রহী না। এ মুহূর্তে আমাদের ১ হাজার ৪১ হেক্টর সবজি মাঠে থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। কৃষকরা শীতকালীন সবজির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। মৌসুমি সবজি বাজারে আসতে শুরু করলে দাম কমবে।

 


ব্যয় বাড়লেও বাড়েনি আয়

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) গবেষণা অনুযায়ী দেশের ৮০ শতাংশ পরিবার সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। ৪০ শতাংশ পরিবারের গড় আয় ১৪ হাজার ৮৮১ টাকা, যেখানে খরচ ১৭ হাজার ৩৮৭ টাকা। ঋণের ওপর নির্ভরশীল ৫২ শতাংশ পরিবার, যাদের এক-তৃতীয়াংশ সংসার খরচ মেটাতে ঋণ নেয়।
জরিপের তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার নিজের প্রয়োজন অনুসারে আয় করতে পারছে না। তাই তাদের সংসার চালাতে ধারদেনা করতে হয়। পিপিআরসি বলছে, ৫২ শতাংশ পরিবারকে কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে ঋণ করতে হয়। এর মধ্যে সংসার চালানোর খরচ মেটাতেই সবচেয়ে বেশি পরিবার ঋণ করেছে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ পরিবার শুধু সংসার চালাতে ধারদেনা করতে বাধ্য হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বর্তমানে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি, আয় বৈষম্য বৃদ্ধি ও সীমিত আয়ের কারণে জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এবং ঋণগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে লাগামছাড়া ঘোড়ার মতো।
নিম্নআয়ের মানুষদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসা ভাড়া বৃদ্ধিসহ নানাখাতের খরচ বাড়াতে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, উচ্চ বাড়ি ভাড়া, মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলসহ নিত্য ব্যবহারের সবকিছুর দাম বাড়ার কারণে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে নাগরিক জীবন। আয় যে হারে বেড়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হারে বাড়ছে ব্যয়। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষার জন্য খরচ করার মতো টাকা তাদের হাতে থাকছে না।
সাজিদ নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, আগে ১২-১৪ হাজার টাকায় যে বাজার করতাম সেটি এখন প্রায় ২০ হাজার টাকা লাগে। এখন আর জমা করার সুযোগ নেই। খরচ বাড়লেও আয় বাড়েনি।
রহিম মিয়া নামে একজন রিকশাচালক বলেন, সব কিছুর দাম বেশি। ৫০০ টাকা আয় করলে খরচ হয় আরও বেশি টাকা। এতে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।
মশিউর রহমান নামে এক স্কুল শিক্ষক বলেন, স্বল্প আয় দিয়ে টানাপোড়নের মধ্যে সংসার চলছে। চাকরিজীবীদের নির্ধারিত বেতনের মধ্যে বৈধ আয়ে সংসার চলে না। আমাদের বেতন বাড়েনি, তবে খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। দ্রব্যমূল্যসহ সব খাতে খরচ বেড়েছে। এতে আমরা মধ্যবিত্তরা বেশি বিপদে পড়েছি। পরিবার নিয়ে শহরে থেকে বাড়তি ব্যয় দিয়ে টিকে থাকা মুশকিল।