প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে ডুবছে ফেনীর সোনাগাজী, দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার নদী ও খালসংলগ্ন বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। তীব্র ভাঙনের কবলে নদী সংলগ্ন জমি। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় জোয়ারের পানিতে ফসলি জমি, মৎস্য ঘের, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি তলিয়ে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গিয়ে নারীশিশু ও বৃদ্ধদের চলাফেরায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হাঁটু সমান পানি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। তিন উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার পরিবার কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় চার শতাধিক ঘরবাড়ি আংশিক ও সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সোরনাগাজীর দক্ষিণ বগাদানার বাসিন্দা শাহেদা আক্তার বলেন, আমার ঘর খালের কাছাকাছি। জোয়ারের পানিতে খালের পাড় ভেঙে বসতঘর এখন বিলীন হওয়ার পথে। সরকারি কোন দপ্তর এদিকে নজর দিচ্ছে না। আমার মতো এ অঞ্চলের শতাধিক পরিবার প্রতিদিন দুইবার করে পানিবন্দি অবস্থায় থাকে।
একই এলাকার বাসিন্দা জুয়েল, আব্দুর শুক্কুর ও আবুল হাসেম বলেন, জোয়ারের পানি আমাদের জন্য এখন স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নলকূপ, হাঁস-মুরগির ঘর ও বসতবাড়ি জোয়ারে পাািনতে তলিয়ে যায়। এ পানির সঙ্গে সাপসহ বিভিন্ন পোকামাকড় লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। সবমিলিয়ে আমরা এখন অনিরাপদ জীবনযাপন করছি।

সায়েদপুরের ইব্রাহিম খলিল সিদ্দিকী বলেন, পানি জমে রাস্তায় কাদা হয়ে গেছে। শিক্ষার্থী ও অসুস্থ রোগীদের যাতায়াতে অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে। নিরাপদ পানির সংকটে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নদীর পানি ব্যবহার করছে। এতে ডায়রিয়া ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা এটির একটি স্থায়ী সমাধান চাই।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, মুছাপুর ক্লোজার বিলীন হওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত জোয়ারের পানি সরাসরি লোকালয়ে ঢুকছে। এতে প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এই ১০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন আমন ধান উৎপাদন কম হবে। যার বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, শুধু আমন ধান চাষের জমি নয়, বরং লবণাক্ততায় প্রকৃতপক্ষে এক হাজার হেক্টরের বেশি কৃষি জমি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, বর্ষাকালে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। ডুবন্ত নিম্নাঞ্চল ছাড়াও আশপাশের আরও কয়েক কিলোমিটার এলাকায় এর প্রভাব পড়ছে। শুষ্ক মৌসুমেও তরমুজ, সরিষা ও ধানসহ অন্যান্য রবি ফসল উৎপাদনে এর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে পড়বে।

স্থানীয় কৃষক শেখ আহম্মদ বলেন, প্রতিবছর ১০০ শতক জমিতে আমন চাষ করতাম। এবার জোয়ারের পানিতে চারা পঁচে গেছে। এখন জমি অনাবাদি পড়ে আছে।

সোনাগাজী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তাছলিমা আকতার দৈনিক ফেনীকে বলেন, ইতোমধ্যে অতি বৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৪০ জনের তালিকা করা হয়েছে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে মৎস্যজীবি অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমেও লোনাপানির কারণে মিঠাপানির মাছ চাষ ব্যাহত হবে, এ প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। এ সংকটের সমাধান আমাদের দপ্তরের হাতের নেই। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতন করতে সরজমিনে গিয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
দাগনভূঞা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, উপজেলার রাজাপুর, সিন্দুরপুর, পূর্বচন্দ্রপুর, রামনগর ও পূর্বচন্দ্রপুর এলাকায় জোয়ারের প্রভাব রয়েছে। এজন্য আমন আবাদে জেলার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে দাগনভূঞা। লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ২০ হেক্টর হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। স্থানীয় খালগুলো দখল ও বাঁধ দেওয়ায় জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আমরা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে অবহিত করেছি।
কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বেলাল হোসেন বলেন, বীজ-সার দিয়ে পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছি। জোয়ারের পানির লবণাক্ততার কারণে ২ হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ভাঙনে ৬৫ থেকে ৭০ হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অতি বৃষ্টি ও জোয়ারের উচ্চতা বাড়ার কারণে ৭০ হেক্টর আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। জোয়ারের প্রভাবে ১৬০ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি দেরিতে আমন রোপণ শুরু করায় এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। আমরা উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বীজ-সার ও প্রণোদনা প্রদান করেছি।

 


‘সহসা মিলছে না সমাধান’

নদী ভাঙন ও জোয়ারের পানিতে ফেনীর সোনাগাজী, দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দাদের ভোগান্তি এখন নিত্যনৈমিত্তিক। তবে এ দুর্ভোগের সহসাই মিলছে না সমাধান। স্থায়ীভাবে সমাধান হতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগ্যান চাকমা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবু মুসা রকি।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. আবু মুসা রকি দৈনিক ফেনীকে বলেন, মুছাপুর রেগুলেটর না থাকায় জোয়ার আর নদী ভাঙ্গন এখন স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা ভাঙনের তীব্রতা কমাতে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ব্যবহার করছি। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। এখন পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার নদীর তীর বড় ভাঙনের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে দেড় কিলোমিটারে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এক কিলোমিটারে কাজ চলমান। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে কাজ করা হবে। বরাদ্দ কম থাকায় আমরা স্থায়ী সমাধানে কাজ করতে পারছি না।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগ্যান চাকমা বলেন, মুছাপুর ক্লোজার না থাকায় প্রাকৃতিকভাবে জোয়ারের পানি বিভিন্ন এলাকায় ঢুকছে। এটি সমাধানে ক্লোজার নির্মাণের প্রস্তুতি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি কার্যক্রম যেন দ্রুত হয়। এতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। এছাড়া জোয়ারের প্রভাবে নদীর যে স্থানগুলো ভেঙে যাচ্ছে সেগুলোতে পদক্ষেপ নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে।