দীর্ঘ ৯ মাসের বকেয়া বেতন আদায় ও চাকরী স্থায়ীকরণের দাবিতে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের চলমান কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। বুধবার (১৯ মার্চ) সকালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইসমাইল হোসেন ও সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিমের আশ্বাসে কাজে ফিরে গেছেন হাসপাতালের ৫৩ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী
জানা যায়, গত মঙ্গলবার সকাল থেকে ১৯ মার্চ বুধবার সকাল ১১ টা পর্যন্ত কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি করে আউটসোর্সিং কর্মচারীরা। সরেজমিনে বুধবার রাত ২টার সময় গিয়েও দেখা যায় হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিছানা পেতে আন্দোলন করতে দেখা যায় তাদের। বিষয়টি নজরে এলে সকাল ১১ টার দিকে হাসপাতালে যান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো.ইসমাইল হোসেন ও সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত করিম। আগামী এক মাসের মধ্যে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের আটকে থাকা বকেয়া বেতন পাওয়ার ব্যবস্থা ও বিনাকারণে কাউকে চাকুরীচ্যুত করা হবে না এমন আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করে কাজে ফিরেন আউটসোর্সিং কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মচারীরা তাদের ৯ মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করার বিষয় জানতে পেরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সিভিল সার্জনসহ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে তাদের দাবি-দাওয়া শুনেছি। নয় মাস ধরে তাদের বেতন বন্ধ থাকাটা খুবই দুঃখজনক। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের বকেয়া বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বেতন-ভাতা যেন যথাসময়ে প্রদান করা হয় সে বিষয়ে সবাইকে আরও বেশি আন্তরিক হওয়া উচিত।
এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, হাসপাতালের ৫৩ জন আউটসোর্সিং কর্মচারীর মধ্যে ২৪ জনের নাম ইতোমধ্যে চুড়ান্ত করা হয়েছে। বাকী ২৯ জনের বিষয়েও কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করছি খুব অল্প সময়ে সকল কর্মচারীর বেতন ভাতা পাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা.আবুল খায়ের মিয়াজির মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের গত দুইদিনের কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে দেখা দেয় নানা বিশৃঙ্খলা। স্থবির হয়ে পড়ে পড়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম। আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগকৃত জনবলের বেতন ভাতা পরিশোধ করার দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ফেনী জেনারেল হাসপাতালে সর্বমোট ৫৩ জন কর্মচারী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মচারী দিয়ে ডোম ও ডোম সহকারী, ওয়ার্ড বয়, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, বাবুর্চি সহকারী, আয়া, মালি, দারোয়ান ও জরুরি বিভাগে কাজ করানো হয়ে থাকে। প্রতিমাসে ঠিকাদারের মাধ্যমে তারা প্রায় ২১ হাজার টাকা হারে বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও হাসপাতালের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজসে তারা মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। কিন্তু ওই টাকাও বিগত ৯ মাস ধরে দেওয়া হচ্ছে না। তারপরও কর্মচারীরা রোগীদের সমস্যার কথা চিন্তা করে সেবা দিয়ে আসছেন।
শফিকুর রহমান নামের রোগীর এক স্বজন জানান, তার মাকে নিয়ে গত তিনদিন তিনি এ হাসপাতালে রয়েছেন। এখানকার বাথরুমগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। যার কারণে ব্যবহার করা যায় না।
সালমা নামের এক রোগী বলেন, এখানে টাকা ছাড়া কর্মচারীদের থেকে কোনো সেবাই পাওয়া যাচ্ছে না। বেতন পাচ্ছে না বলে রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে তারা। টাকা দিলে কাজ করে, টাকা না দিলে খারাপ আচরণ করে।
ঝর্ণা রানী নামের আউটসোর্সিংয়ের কাজে নিয়োজিত এক কর্মচারী জানান, জুন মাসের পরে আর কোনো বেতন পাইনি। দীর্ঘ ৯ মাস বেতন না পেয়েও সংসারের ঘানি টানছি। ৫ মাসের বাসা ভাড়া বকেয়া পড়েছে। মানবেতর জীবনযাপন করছি। এভাবে কতদিন কাজ করা যাবে?
সুমন নামের এক কর্মচারী বলেন, আমাদের জন্য বরাদ্দ হয় ২০/২২ হাজার টাকা। আমাদের দেওয়া হয় ৮ হাজার টাকা। বাকী টাকা কার পকেটে যায় আমাদের জানা নেই।
ইলিয়াস নামের আরেক কর্মচারী বলেন, হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেদের হর্তাকর্তা ভাবেন। বকেয়া বেতনের কথা বললে তারা আমাদের চাকুরী ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেন।
হাসপাতালের মর্গে নিয়োজিত আউটসোর্সিং কর্মচারী আবদুর রহিম বলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন এক মাসের মধ্যে সকল কর্মচারীর বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হবে। সে আশ্বাসে আমরা আমাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছি।