ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলা ফেনীর তিনটি উপজেলা পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে দীর্ঘদিন অবাধে ব্যবহার হচ্ছে ভারতীয় বিভিন্ন মোবাইলফোন কোম্পানির সিমকার্ড। শুধু সীমান্তে নয়, এমন সিমের ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে খোদ ফেনী শহরেও। অর্থাৎ, ভারতীয় মোবাইলফোন নেটওয়ার্কের তরঙ্গ কম্পাংকের আওতায় রয়েছে ফেনী শহরসহ চার উপজেলার বিশাল এলাকা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফেনী সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করে চোরাকারবারিদের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ের এর ব্যবহার বৃদ্ধিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহারের অবাধ সুযোগ নিয়ে অপতৎপরতার শঙ্কাও রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় মোবাইল সিমের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ সীমান্তে তরুণদের দাবি, দেশীয় মোবাইলফোন কোম্পানিগুলোর ইন্টারনেট সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে তারা ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করেন। তারা গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ ইন্টারনেটভিত্তিক ফ্রি-ফায়ার, পাবজির মতো গেমও খেলছেন। তারা তাদের মোবাইলফোনে ব্যবহার করেন ভারতীয় কোম্পানির এয়ারটেল, জিও, ভোডাফোন, রিলায়েন্স, এয়ারসেল, টেলিনরসহ বিভিন্ন কোম্পানির সিম।
সীমান্তবর্তী আমজাদহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ইব্রাহিম মজুমদার বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল ভারতীয় সিম ব্যবহার করে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ইতোপূর্বে আমরা ভারতীয় সিমকার্ডের বিষয়ে প্রশাসনকে জানিয়েছি। এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য নিরাপত্তা হুমকি। আমরা এসবের প্রতিকার চাই।
এ প্রসঙ্গে পরশুরাম উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মনির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা সীমান্তের মানুষ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্কের ব্যবহার হুমকি হিসেবে দেখছি। ভারতে বসে সন্ত্রাসীরা এবারের নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করছে। এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
ফেনী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শাখার সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট এমদাদ হোসাইন দৈনিক ফেনীকে জানান, ভিনদেশি সিম রাষ্ট্রের গোপনীয়তার জন্য হুমকি। নির্বাচন উপলক্ষ্যে অবৈধ অস্ত্রও দেশের অভ্যন্তরে এসেছে শুনেছি। বিষয়টি খুবই উদ্বেগ হিসেবে দেখছি।
ছাগলনাইয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলমগীর বিএ বলেন, বিষয়টি আমাদের জন্য সুখকর নয়। এই সিমগুলো অসাধু লোকরা ব্যবহার করে দেশকে বিপদে ফেলতে চাইছে। আমরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এ প্রসঙ্গে সীমান্তের চেতনা সংঘ ক্লাবের সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম রাজিব বলেন, ভারতীয় সিমের অবাধ ব্যবহারের কারণে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় চোরাকারবারিদের সঙ্গে বাংলাদেশের চোরাকারবারি ও মানবপাচারকারীরা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তারা মাদকপাচারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এতে করে সীমান্ত এলাকায় অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। টাকার লোভে কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধরা অবৈধ কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন।
এদিকে সীমান্তে দীর্ঘ বছর ভারতীয় সিমকার্ডের অবাধ ব্যবহারের খবর জানে না সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। এ সম্পর্কিত কোন তথ্য কিংবা ভারতীয় সিম ব্যবহার করে কোন অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ কেউ কখনো থানায় করতে আসেনি বলে জানায় পুলিশ।
ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, আমি সদ্য যোগদান করেছি। এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো তথ্য পাইনি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। ইতোপূর্বে কাউকে ভারতীয় সিমসহ আটক করা হয়নি।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমরা শুনেছি, তবে এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে সিমসহ কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
ছাগলনাইয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীন মিয়া বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এরকম কোনো অভিযোগ আসেনি। ভারতীয় সিমসহ ইতোপূর্বে কাউকে আটক করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে জানান, ভারতীয় সিমের বিষয়টি আমরা এর আগেও জেনেছি, এটি জাতীয় ইস্যু। আমাদের মাধ্যমে সরকারকে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করব।
জেলা প্রশাসক মনিরা হক দৈনিক ফেনীকে জানান, এখন পর্যন্ত আমরা এই ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি এরকম কোনো সিমকার্ড পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দেড় থেকে ৫ হাজার
টাকায় মেলে সিমকার্ড
সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে সরেজমিনে জানা গেছে, ছাগলনাইয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন শুভপুর ও মহামায়া, ফুলগাজী উপজেলার সীমান্তবর্তী সদর ইউনিয়ন, আমজাদহাট, আনন্দপুর, মুন্সীরহাট এবং পরশুরাম উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন বক্সমাহমুদ ও মির্জানগরের বিভিন্ন গ্রামে ভারতীয় সিমকার্ডে চলছে ইন্টারনেট ভিত্তিক সকল ব্যবহার। শুধু তাই নয়, ভারতীয় সিমগুলোর ইন্টারনেট তরঙ্গ কম্পাংক ক্ষমতা এতটাই যে, ফেনী শহরে বসেও ভারতীয় মোবাইলফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নেট দুনিয়ায় সহজ বিচরণ সম্ভব হচ্ছে। জানা গেছে, দেড় থেকে ৫ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ভারতীয় সিমকার্ড।
ভারতীয় সিম বিক্রি চক্রের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভারতীয় সিমকার্ডগুলো দেড় হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা দামে বিক্রি করে থাকি। ইদানিং এর বিক্রি বাড়ছে। সীমান্তের অধিকাংশ মানুষ এখন ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করছে। এগুলোর রিচার্জও আমরা বাংলাদেশে বসে করা থাকি।
তবে ভারতীয় মোবাইল সিমকার্ড ব্যবহারকারী বাংলাদেশি এক নাগরিক জানান, বাংলাদেশের মোবাইল কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশি সিম অপারেটর কোম্পানিগুলোকে বারবার অনুরোধ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
