দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবাসেও বইছে ভোটের হাওয়া। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার পাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেনী জেলায় পোস্টাল ভোটারের মোট সংখ্যা ৪০ হাজার ১৯৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৬ হাজার ৯২ জন এবং নারী ৪ হাজার ১০৫ জন। ইতোমধ্যে ৩৯ হাজার ৫২ জন ভোটারের নিবন্ধন অনুমোদিত হয়েছে ও ১ হাজার ১৪৫ জনের নিবন্ধন এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

একই সূত্রে জানা যায়, পোস্টালে ফেনী-১ আসনে (পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া) মোট ১১ হাজার ১৬০ জন ভোটার। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১০ হাজার ৬৭ ও নারী ১ হাজার ১৯৩ জন। বর্তমানে ১০ হাজার ৫৮৯ জনের নিবন্ধন অনুমোদিত হয়েছে ও ৬৭১ জনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ফেনী-২ আসনে (ফেনী সদর) মোট ১২ হাজার ৮১৩ জন ভোটার। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ৩১৪ ও মহিলা ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ৪৯৯। এর মধ্যে ১২ হাজার ৬১০ জনের নিবন্ধন অনুমোদিত হয়েছে, বাকি ২০৩ জনের নিবন্ধন এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়।

এছাড়া ফেনী-৩ আসনে (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) ১৬ হাজার ১২৪ জন ভোটার। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৭১১ জন পুরুষ এবং ১ হাজার ৪১৩ জন নারী। অনুমোদিত ভোটারের সংখ্যা ১৫ হাজার ৮৫৩ জন ও ২৭১ জন এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ আসনটি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দেশের শীর্ষে রয়েছে।

এর আগে, গত ১৮ নভেম্বর শুরু হওয়া এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া গত ৫ জানুয়ারি রাত ১২টায় শেষ হয়। নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে এবার সর্বমোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। পোস্টাল ভোটার নিবন্ধনকারীদের মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪৩৫ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪৬ জন।

এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ফেনীতে প্রায় ৪০ হাজার পোস্টাল ভোটার নির্বাচনের জয়-পরাজয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা একটি ইতিবাচক দিক। দেশের এক শ্রেণির মানুষ ভোট দিতে পারবে, আর আরেক শ্রেণির মানুষ পারবে না-এটি হতে পারে না। এ উদ্যোগে যারা দেশের বাইরে কাজ করেন তারাও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগ ও দাবির প্রেক্ষিতেই প্রবাসীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রথম থেকেই দাবি তোলে জামায়াতে ইসলামী। এর মাধ্যমে প্রবাসীরা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। প্রবাসীরা যে ভোট দেবেন, তার প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে দেশের বাইরে ও দেশের ভেতরে যারা ভোটের দিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন, তারা নিজ আসনে ভোট প্রদান করতে পারবে। স্বচ্ছতার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া নিশ্চিত হবে।

পোস্টাল ভোটের গণনার বিষয়ে তিনি জানান, ডাক বিভাগের মাধ্যমে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সব পোস্টাল ব্যালট পৌঁছাবে। ফেনীতে তিনটি আসনের জন্য তিনটি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একজন প্রিজাইডিং অফিসার থাকবেন এবং প্রয়োজন হলে পোলিং অফিসারও উপস্থিত থাকবেন। ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হওয়ার পর কেন্দ্রভিত্তিকভাবে পোস্টাল ব্যালটগুলোর গণনা শুরু হবে।

ভোট দেবেন ৮৫ কারাবন্দি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট প্রদানের জন্য নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারগণ ইন কান্ট্রি পোস্টাল ভোটের (আইসিপিভি) নিবন্ধন করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় ফেনীর ৮৫ জন কারাবন্দি ভোট দেবেন।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেনী জেলায় পোস্টাল ভোটারের সংখ্যা মোট ৪০ হাজার ১৯৭ জন। একই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইন কান্ট্রি পোস্টাল ভোটিং আপডেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেনীতে ইন কান্ট্রি পোস্টাল ভোটে মোট নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৯ হাজার ৭৭২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ হাজার ৭৩৯ জন ও মহিলা ৩ হাজার ৩৩ জন।

ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইন কান্ট্রি পোস্টাল ভোটে নিবন্ধনকারীর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ৬ হাজার ৩৭৩ জন, নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩ হাজার ১৩২ জন, আনসার ও ভিডিপি ১৮২ জন ও কারাবন্দি রয়েছেন ৮৫ জন। তারমধ্যে ৮ হাজার ৮১৫টি নিবন্ধন অনুমোদন করা হয়েছে ও ৯৫৭ জনের নিবন্ধন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম দৈনিক ফেনীকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী ফেনী জেলায় পোস্টাল ভোটের জন্য মোট ৪০ হাজারের বেশি। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসী ভোটার, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী ও আইনি হেফাজতে থাকা ভোটাররা। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন অফিসের ওপর অর্পিত সব দায়িত্ব যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রবাসীদের উচ্ছ্বাস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না থেকেও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ফেনীর প্রবাসীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা জানিয়েছেন, এই সুযোগ তাদের মাতৃভূমির নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করার অভিজ্ঞতা দেবে।

ইমাম হোসেন শাকিল নামে দুবাইতে কর্মরত পরশুরামের বীরচন্দ্র নগর গ্রামের এক যুবক দৈনিক ফেনীকে বলেন, প্রবাসে থাকার কারণে এ পর্যন্ত কখনো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে এবার প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে থাকলেও নিজের নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকা সত্ত্বেও এবার আমরা মাতৃভূমির নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারব, যা আমাদের জন্য গর্বের।

কুয়েতে কর্মরত দাগনভূঞার প্রবাসী আজগর হোসেন রাজু বলেন, পরিবারের কারণে বিদেশে থাকলেও এবার আমরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনে অংশ নিতে পারব। ভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যত নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারা প্রবাসীদের জন্য এক অনন্য সুযোগ।

ইতালিতে বসবাসরত দাগনভূঞার তাজদিদুর রহমান নামে আরেক প্রবাসী বলেন, আগে দেশে থেকেও আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। প্রবাসী হিসেবে দেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা কখনো ভাবিনি। এবার পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে প্রবাসীরাও ভোট দিতে পারবে, যা আমাদের জন্য এক অনন্য সুযোগ।

পোস্টাল ব্যালটে যেভাবে ভোটগ্রহণ
পোস্টাল ভোট বিডি মোবাইল অ্যাপে নিবন্ধিত সব ভোটারের কাছে পর্যায়ক্রমে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধিত ভোটাররা তাদের ঠিকানায় নির্বাচন কমিশনের পাঠানো পোস্টাল ব্যালটসহ খাম পাবেন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্রে জানা যায়, খাম পাওয়ার পরপরই ভোটাররা পোস্টাল ভোট বিডি মোবাইল অ্যাপে লগইন করে খামের ওপর থাকা কিউআর কোডটি স্ক্যান করবেন। এতে তিনি যে ব্যালট পেপারটি হাতে পেয়েছেন তা সিস্টেমে শনাক্ত হবে।

ভোটাররা নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া বহির্গামী খামে একটি পোস্টাল ব্যালট সংলিত খামের মধ্যে পোস্টাল ব্যালট পেপার, একপাশে ভোট দেওয়ার নির্দেশনা, অপর পাশে একটি ঘোষণাপত্র সংবলিত একটি পৃথক কাগজ এবং একটি ফেরত খাম পাবেন, যেখানে সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা মুদ্রিত থাকবে।

ব্যালট পেপারে সব প্রতীক মুদ্রিত থাকবে যার প্রতিটি প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘর থাকবে। ভোট দেওয়ার আগে ভোটাররা নির্দেশনাপত্র পড়ে ঘোষণাপত্রে যথাযথভাবে ব্যালট পেপারের ক্রমিক নং, ভোটারের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করে সই করবেন।

নিরক্ষর অথবা অক্ষম ব্যক্তি অন্য একজন বৈধ ভোটারের সাহায্যে ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট অংশ পুরণের পর সত্যয়ন করে সই করবেন। এই ঘোষণাপত্র বাঁ সত্যয়নপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ছাড়া ব্যালট পেপারটি বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না। আর প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হলে অ্যাপের মাধ্যমে অথবা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে ভোটাররা জানতে পারবেন।

ভোট দেওয়ার জন্য ভোটাররা অ্যাপে লগইন করে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীদের তালিকা দেখতে পাবেন এবং নির্দেশিকাতে প্রদত্ত পদ্ধতিতে ব্যালট পেপারে মুদ্রিত প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘরে টিক বাঁ কিংবা ক্রস চিহ্ন দেবেন। ভোট দেওয়ার পদ্ধতির ভিডিও টিউটোরিয়াল বা ডিজিটাল কন্টেন্ট থাকবে অ্যাপে।

পোস্টাল ব্যালট পেপারে ভোটার ভোট চিহ্নিত করার পর শুধুমাত্র ব্যালট পেপারটি ছোট খামে রেখে খামটি বন্ধ করবেন। এরপর এই ব্যালট পেপার সংবলিত খামটি এবং সই করা ঘোষণপত্রটি রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা মুদ্রিত খামে প্রবেশ করিয়ে বন্ধ করতে হবে। এরপর খামটি ডাকযোগে দ্রুত পাঠাতে হবে।

উভয় খামই সেলফ অ্যাডহেসিভযুক্ত থাকবে। ফলে সেলফ অ্যাডহেসিভ অংশের উপরিভাগের টেপটি খুলে নিলেই খাম বন্ধ হবে। খামটি পাঠানোর জন্য কোনো ডাক মাশুল প্রেরককে দিতে হবে না। পোস্টাল ভোট গণনা শুরু করার আগ পর্যন্ত প্রাপ্ত পোস্টাল ব্যালট পেপারগুলোই কেবল গণনার আওতায় আসবে।

নির্বাচন কমিশন থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে পোস্টাল ব্যালট ভোটারের কাছে পাঠানোর পর থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফেরত আসা পর্যন্ত সমগ্র প্রক্রিয়াটি বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যালটের অবস্থান মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

পোস্টাল ব্যালট পেপার গণনার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি গণনাকক্ষ প্রস্তুত করা হবে। পোস্টাল ভোট গণনার সময় প্রার্থী, নির্বাচনি এজেন্ট, প্রার্থীর প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, পর্যবেক্ষকরা অন্যান্য কেন্দ্রের মতো একই নীতিমালা অনুসরণ করে উপস্থিত থাকতে পারবেন।

পোস্টাল ব্যালট পেপার গণনা শেষ হলে অন্যান্য সাধারণ কেন্দ্রের মতো পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের পাঠানো সাধারণ ভোটকেন্দ্রের ফলাফলের পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটে প্রাপ্ত ভোটের হিসাব ঘোষণা ও অন্যান্য কেন্দ্রের ফলের সঙ্গে এক করে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করবেন। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রাপ্ত ভোটের হিসাব এক না করে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা যাবে না।