ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক, প্রার্থী আর ভোটের মাঠের উত্তাপে গণভোট যেন আড়ালে রয়ে গেছে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা তথ্য অফিসের পক্ষ থেকে গণভোট বিষয়ে ‘ব্যাপক প্রচারণা’র দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে ভোটারদের এ নিয়ে তেমন আগ্রহ ও সাড়া দেখা যায়নি। ফেনীর তিনটি আসনের অন্তত ৩০ জন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র ওঠে এসেছে।
ভোটাররা বলছেন, নির্বাচন ও প্রার্থী নিয়ে যেভাবে আলোচনা চলছে, সেদিক থেকে গণভোট নিয়ে খুব বেশি আলোচনা নেই। শহরব্যাপী কিছুটা আলোচনা বা বিলবোর্ড চোখে পড়লেও গ্রামের মানুষ এখনো এ বিষয়ে খুব বেশি অবগত না।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ফেনীর ছয় উপজেলা ও পৌর এলাকায় বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন স্থাপন, লিফলেট বিতরণ, মাইকিং ও ভোটের গাড়ির মাধ্যমে গণভোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফেনী শহরের ট্রাংক রোড শহিদ মিনার সংলগ্ন সড়ক ডিভাইডারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গণভোটের ফেস্টুন ও ব্যানার টাঙানো হয়েছে। জেলা তথ্য অফিসের গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে মাইকিং করা হচ্ছে। জেলা সদরের ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, বাজার ও জনবহুল এলাকাতেও প্রচারণা চালানো হলেও ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া চোখে পড়েনি। তবে গ্রামেগঞ্জে এখনও গণভোটের বিলবোর্ড, পোস্টার বা লিফলেট চোখে পড়েনি।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী সদরে ৩টি, ফুলগাজীতে ২টি, সোনাগাজীতে ২টি ও ছাগলনাইয়ায় ২টি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আরও বিলবোর্ড স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া ফেনী পৌর এলাকায় ২৫টি বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লিফলেট বিতরণের ক্ষেত্রে সোনাগাজীতে ১৮ হাজার, ফেনী সদরে ৩০ হাজার, ফুলগাজীতে ৮ হাজার, পরশুরামে ৭ হাজার, ছাগলনাইয়ায় ১২ হাজার এবং দাগনভূঞায় ১৬ হাজার লিফলেট এসেছে, যা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ভোটের গাড়ি ফুলগাজী ও পরশুরাম ছাড়া বাকি চারটি উপজেলায় মোট পাঁচটি স্থানে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
এছাড়া দাগনভূঞা উপজেলায় ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার জন্য ১৮টি ব্যানার অর্ডার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪টি বিলবোর্ডে স্থাপন করা হবে। নির্বাচন অফিস থেকে পাওয়া ১৬ হাজার লিফলেট ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণ শুরু হয়েছে। দাগনভূঞা বাজারের জিরো পয়েন্টে এক স্থানে ভোটের গাড়ি ক্যাম্পেইন করেছে। জনবহুলস্থানে ৯০টি ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে।

ফেনী সদর উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নের জন্য ১৪টি ব্যানার অর্ডার করা হয়েছে, যার মধ্যে ২টি বিলবোর্ডে ব্যবহার হবে। ৩০ হাজার লিফলেট বিতরণের প্রক্রিয়া রয়েছে। পাইলট স্কুল মাঠ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দুই স্থানে ভোটের গাড়ি কার্যক্রম চালিয়েছে। সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১২০টি ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে।

পরশুরাম উপজেলায় ৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার জন্য ১২টি ব্যানার অর্ডার করা হয়েছে, যা ৭টি বিলবোর্ডে স্থাপন করা হবে। ৭ হাজার লিফলেট ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। এ উপজেলায় ভোটের গাড়ি এখনো কার্যক্রম চালায়নি। জনবহুল স্থানে ৪০টি ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে।

ফুলগাজী উপজেলায় উপজেলা পরিষদ ও ৬টি ইউনিয়নের জন্য ১২টি ব্যানার অর্ডার করা হয়েছে, যার মধ্যে ২টি বিলবোর্ডে যাবে। ৬ হাজার লিফলেট বিতরণ শুরু হয়েছে। ফুলগাজী উপজেলায় ভোটের গাড়ির কার্যক্রম হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় ৩৬টি ফেস্টুন স্থাপন করা হয়েছে।

জেলা তথ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিসিক সংলগ্ন মহাসড়ক, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে, রেলস্টেশন এবং সদর উপজেলা পরিষদের সামনে চারটি স্থায়ী ডিসপ্লে বোর্ড রয়েছে। দাগনভূঞা বাজার, সোনাগাজী জিরো পয়েন্ট, ফেনী সরকারি কলেজ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ভোটের গাড়ির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রচারণা চালানো হয়েছে। এছাড়া ‘ভোটালাপ’ ও ‘টেন মিনিট ব্রিফ’সহ উঠান বৈঠক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা চলছে।

নাজির রোড এলাকার ব্যবসায়ী সিদ্দিক আহমেদ বলেন, গণভোটের বিষয়ে তথ্য অফিসের গাড়িতে মাইকিং করতে শুনেছি। তবে নির্বাচন নিয়ে যেমন প্রচার-প্রচারণা, গণভোটের বিষয়ে তেমন আলোচনা নেই। লিফলেট বিলবোর্ড এসব সাধারণ মানুষের কাছে এখনো পৌঁছেনি। বাসাবাড়ির নারী ও খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষরা এখনো গণভোট সম্পর্কে পুরোপুরি জানে না।

ছাগলনাইয়া এলাকার ভোটার নুসরাত জাহান বলেন, জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হবে শুনেছি। তবে গণভোটের কোন প্রচারণা শুনতে পাইনি। কীভাবে ভোট দিতে হবে সেটিও এখনো পুরোপুরি অবগত না। শহরের কিছু মানুষ এ বিষয়ে জানলেও আমরা যারা গ্রামে থাকি গণভোটের বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট না।

রাকিবুল হাসান নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, আমরা যারা তরুণ আছি তারা গণভোটের বিষয়ে অবগত, তবে গ্রামের অনেক মানুষ এ বিষয়ে এখনো জানেন না। নির্বাচনের আলোচনায় এটি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের বিলবোর্ড, লিফলেট শহরে চোখে পড়লেও গ্রামপর্যায়ে তা এখনো দেখা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ তৃণমূল পর্যায়ে গণভোটের বিষয়ে প্রচারণা আরও বাড়াতে হবে।

জেলা তথ্য কর্মকর্তা এস এম আল আমিন বলেন, গণভোটের প্রচারণার অংশ হিসেবে সড়কে প্রচার, উঠান বৈঠক আয়োজন করা ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ভিডিও কনটেন্টের মধ্যমে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। এছাড়া ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ে গণভোট বিষয়ে ‘ভোটালাপ’ ও ‘টেন মিনিট ব্রিফ’ নামক প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। তবে তথ্য অফিসের মাধ্যমে গণভোট বিষয়ক কোন প্রচারপত্র বিলি হচ্ছে না।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রোমেন শর্মা বলেন, গত ৭ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে গণভোট ক্যাম্পেইন বিষয়ে কিছু দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী ফেনীতে গণভোট বিষয়ক ব্যাপক ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে জেলা নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে ছয় উপজেলার জন্য গণভোটের ৯১ হাজার লিফলেট নির্বাচন কমিশন থেকে প্রেরণ করা হয়েছে। যা উপজেলার মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। গণভোটের প্রচারণায় প্রতিটি উপজেলা ও পৌরসভা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিলবোর্ড স্থাপন করবে। কিছু কিছু জায়গায় কিছু কিছু বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো কিছু বিলবোর্ড স্থাপন করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, গণভোটের প্রচারণায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা যুক্ত আছেন। ইতোমধ্যে নির্দেশনা অনুয়ায়ী লিফলেট বিতরণ, বিলবোর্ড স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মতবিনিময় সভা, অবহিতিকরণ সভা আয়োজন করা হচ্ছে। জেলা তথ্য অফিস কর্তৃক উঠান বৈঠক হচ্ছে। পাশাপাশি মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, তারা অভিভাবকদের এ বিষয়ে অবগত করবেন।