২০১৮ সালের একাদশ থেকে ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সাত বছরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও তার স্ত্রী নাজমুন নাহার হাসির সম্পদে ঘটেছে চোখে পড়ার মতো বড় উল্লম্ফন। এক সময় যেখানে তাদের সম্মিলিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল সীমিত, সেখানে সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী বর্তমানে তারা দুজনই কোটি সম্পদের মালিক।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া রফিকুল আলম মজনুর হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি ও তার স্ত্রী বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক। একই সঙ্গে মজনুর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মোট ১৬৮টি মামলার তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের হলফনামায় তার নামে মোট ৫৭টি মামলা দেখানো হয়েছে।

হলফনামায় দেওয়া অনুযায়ী, রফিকুল আলম মজনু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে ১ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৩ টাকা আয় দেখিয়েছেন। একই রিটার্নে তার মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৯৬ হাজার ২৩ টাকা এবং প্রদত্ত আয়করের পরিমাণ ৩২ লাখ ৭৮ হাজার ২৬৫ টাকা।

২০১৮ সালে হলফনামা অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয়কর রির্টান অনুযায়ী তার বাৎসরিক আয় দেখিয়েছেন ৭ লাখ ১১ হাজার ৭৪৮ টাকা। বাড়ি, এপার্টম্যান্ট, দোকান ও অন্যান্য ভাড়া থেকে বাৎসরিক আয় ৫ লাখ ১৬ হাজার, ব্যবসা থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা, অন্যান্য খাতে ৭০ হাজার ১৪৮ টাকা আয় দেখিয়েছেন।

অন্যদিকে, তার স্ত্রী নাজমুন নাহার হাসি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ১৫ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছেন। তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখ ৭ হাজার ৯১৯ টাকা এবং প্রদত্ত আয়করের পরিমাণ ১ লাখ ৩২ হাজার ৮০০ টাকা।

রফিকুল আলম মজনু পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। যেখানে তিনি মের্সাস ইমা এন্টারপ্রাইজ, মা এন্টারপ্রাইজ ও মায়াজ ট্রেডিং কর্পোরেশন নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী। এছাড়া তার স্ত্রীর পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে মাশফী ইলেকট্রনিক্সের স্বত্ত্বাধিকারী উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে, ২০১৮ সালে হলফনামায় তার স্ত্রীর কোনো আয় উল্লেখ করা হয়নি।

হলফনামা অনুযায়ী, বর্তমানে রফিকুল আলম মজনুর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৭০০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর শান্তিনগরে ছয় তলা বাড়ির একটি অংশ ৫৯ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা, জাতীয় ভলিবল স্টেডিয়ামে ১০ হাজার ১৬২ বর্গফুটের দোকান ১২ লাখ ৮ হাজার টাকা, ঢাকার শান্তিনগরে কনকর্ড মার্কেটের টুইন টাওয়ারে ১৯ দশমিক ৫৭ বর্গমিটারের দোকান ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ছাগলনাইয়ায় ৫৩ লাখ ৯০ হাজার টাকার জমি, রাজধানীর পল্টনে চায়না টাউন মার্কেটে ৩৫০ দশমিক ৫৮ বর্গফুটের দোকান ১৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩২০ টাকা, ঢাকার শান্তিনগরে ১ হাজার ৫১৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ১৩ লাখ ১১ হাজার টাকা, দক্ষিণ শাহজাহানপুরে ১ হাজার ৫৪৭ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং একই এলাকায় ১ হাজার ৫১৪ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাটের ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের হলফনামা অনুযায়ী, রফিকুল আলম মজনুর স্থাবর সম্পদে পরিমাণ দেখিয়েছেন ৯০ লাখ ১০ হাজার ৬৬৭ টাকা। এরমধ্যে রাজধানীর শান্তিনগরে ছয় তলা বাড়ির একটি অংশ ৫৯ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৭ টাকা, জাতীয় ভলিবল স্টেডিয়ামে ১৭০ বর্গফুটের দোকান ১২ লাখ ৮ হাজার টাকা, ঢাকার শান্তিনগরে কনকর্ড মার্কেটের টুইন টাওয়ারে ১৯ দশমিক ৫৭ বর্গমিটারের দোকান ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ঢাকার শান্তিনগরে ১ হাজার ৫১৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ১৩ লাখ ১১ হাজার টাকা।

২০২৫ সালের হলফনামায় মজনুর অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকা ব্যাংকে জমা ৩ লাখ টাকা, ইউসিবিএল ব্যাংকে এফডিআর ২০ লাখ, নোহা মাইক্রো ৩৪ লাখ, আসবাবপত্র ৯০ হাজার, ইলেকট্রনিক পণ্য ১ লাখ, নগদ ২৭ লাখ ৪৮ হাজার ৩২২ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ৬৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬৭৬ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ২০০৬ সালে ২০ আগস্ট থেকে একটি পিস্তল, একটি শটগান ও তাজা গুলি ব্যবহার করছেন, যার বাজারমূল্য ৮৬ হাজার ৩৫০ টাকা।

এর আগে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলফনামা তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছেন ৬৫ লাখ ৮০ হাজার ৩৮২ টাকা। এরমধ্যে নগদ ১০ লাখ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০৭ টাকা, বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রের বা স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৫ টাকা, মাইক্রো নোহা ৩৪ লাখ, ইলেকট্রনিকস বাবদ ১ লাখ টাকা, আসবাবপত্র ৯০ হাজার টাকা, অন্যান্য খাতের মধ্যে ডিপিএস ১১ লাখ ৪০ হাজার সম্পদ দেখিয়েছেন।

২০২৫ সালের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে তার স্ত্রী নাজমুন নাহার হাসির নামে স্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ঢাকার জাতীয় ভলিবল স্টেডিয়াম এলাকায় ১৭১ বর্গফুটের দোকান ২৪ লাখ ৮ হাজার টাকা, ঢাকার রামপুরা বনশ্রী এলাকায় ৬ তলা আবাসিক ভবন ১ কোটি ১১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৬ টাকা, রাজধানীর পল্টনে ৮৫০ বর্গফুটের অফিস ৩৮ লাখ ৯ হাজার ১২০ টাকা এবং রাজধানীর আউটার সার্কুলার রোডের এক হাজার ৯৫৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ৪৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫৬০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৮ সালে হলফনামা অনুযায়ী, তার স্ত্রী নামে স্থাবর সম্পত্তি মোট পরিমাণ দেখিয়েছেন ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৬ টাকা। এরমধ্যে ঢাকার জাতীয় ভলিবল স্টেডিয়াম এলাকায় ১৭১ বর্গফুটের দোকান ২৪ লাখ ৮ হাজার টাকা ও ঢাকার রামপুরা বনশ্রী এলাকায় ৬ তলা আবাসিক ভবন ১ কোটি ১১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৬ টাকা।

২০২৫ সালের হলফনামায় অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে তার স্ত্রীর নগদ অর্থ ৩০ লাখ ৯৭ হাজার ৮৭৯ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ২২ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯২ টাকা, ইলেকট্রনিক পণ্য ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও আসবাবপত্র ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। হলফনামায় মূল্য উল্লেখ না করলেও রফিকুল আলম মজনুর ২০ ভরি ও তার স্ত্রীর ৫০ ভরি স্বর্ণালংকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের হলফনামা অনুযায়ী তার স্ত্রী নামে অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭১৬ টাকা। এরমধ্যে নগদ ৫ লাখ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৮৮ হাজার ৭১৬ টাকা, ইলেকট্রনিকসামগ্রী বাবদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আসবাবপত্র বাবদ ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, অন্যান্য খাতে ৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা সম্পদ দেখিয়েছেন।

একাদশ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রফিকুল আলম মজনুর নামে ২০ ভরি এবং তার স্ত্রী নাজমুন নাহার হাসির নামে ৫০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। দুই নির্বাচনের হলফনামায় স্বর্ণের পরিমাণ একই দেখানো হয়েছে।

২০২৫ সালের হলফনামা অনুযায়ী, বর্তমানে রফিকুল আলম মজনুর নামে শেয়ারের বিপরীতে ঋণ রয়েছে ৫৭ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫৩ টাকা। এছাড়া বাড়ির ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ৪৯৯ টাকা এবং গাড়ি ক্রয় বাবদ ঋণ দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ১১২ টাকা।

মুন্সী রফিকুল আলম মজনু ১৯৭২ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে ফেনী সদর উপজেলার ইজ্জতপুরের সাতবাড়ি গ্রামে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর শান্তিনগরের শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি এলাকায় বসবাস করছেন। তার পিতার নাম মুন্সি গোলাম মোস্তফা ও মাতার নাম রোজিয়া বেগম। তার সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে স্নাতকোত্তর (ব্যবস্থাপনা)। এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ফেনী-১ আসন থেকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন মজনু।