‘রাফার আব্বু তোমার ওপর আমার কোনো দাবি নাই। তুমি আমারে মাফ করিয়া দিয়ো। আমি তোমারে মাফ করিয়া দিলাম। তোমার কথাতে আমি কোনো কষ্ট নেই নাই।’
সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে রংপুরের কাউনিয়ার হারাগাছ পৌর শহরের ধুমেরপাড় এলাকায় লাশবাহী গাড়িতে থাকা স্বামী মো. মোরশেদ হোসেনকে শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে এভাবেই বুকফাটা আহাজারি করছিলেন তার স্ত্রী রুনা আক্তার। এ সময় বারবার মূর্ছা যান তিনি।
এর আগে রোববার (২২ মার্চ) পরিবারসহ কক্সবাজার যাওয়ার সময় ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মোরশেদ হোসেন।
নিহত মোরশেদ রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ পৌর শহরের ধুমেরপাড় এলাকার মৃত মোক্তার হোসেনের ছেলে।
রুনা আক্তার বলেন, ‘রাফার আব্বু, তোমারে অনেক কষ্ট দিছি। তুমি আমারে মাফ করিয়া দিয়ো। ও রাফার আব্বু, তুমি আমারে মাফ করিয়া দিয়ো।’
এ সময় তার এই আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ। অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
নিহত ব্যক্তির বড় ভাই সোহেল মিয়া জানান, তার ছোট ভাই মোরশেদ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন। ঢাকার বাংলামোটর এলাকায় মোরশেদের মোটর পার্সের ব্যবসা রয়েছে। তিনি মাঝেমধ্যে হারাগাছে গ্রামের বাড়িতে আসতেন।
নিহত মোরশেদের মা মোর্শেদা বেগম জানান, ছোট নাতনি আয়নার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা পূরণ করতে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন তার ছেলে মোরশেদ। ছোট মেয়েকে সমুদ্র দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা বিষাদে রূপ নিল। ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় তার ছেলে লাশ হয়ে ফিরলেন।
প্রতিবেশী আকবর আলী বলেন, ‘মোরশেদ খুব ভালো ছেলে ছিল। সে গ্রামে এলে এলাকায় অসহায় মানুষদের সহযোগিতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করতেন। এভাবে তার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছেন না এলাকার কেউই। তার ছোট দুই মেয়ে ও স্ত্রী কীভাবে বাঁচবে, সেটাই এখন সবাইকে ভাবাচ্ছে।’
নিহত ব্যক্তির বড় ভাই সোহেল মিয়া বলেন, ‘ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গ থেকে রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে মোরশেদের মরদেহ হারাগাছে গ্রামের বাড়ি নিয়ে আসা হয়। পরে সকাল ১০টায় মরদেহ নেয়া হয় ধুমেরপাড় সিনিয়র আলিম মাদ্রাসা মাঠে। সেখানে জানাজা শেষে জয় বাংলা বাজারে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।’
গত রোববার (২২ মার্চ) রাতে ঈদ উদযাপন শেষে নিজে মাইক্রোবাস চালিয়ে স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নিয়ে কক্সবাজারে সমুদ্র দেখতে রওনা হন। ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স ও বাসের সংঘর্ষে সড়কে জটলার সৃষ্টি হয়। এ সময় রাস্তার পাশে মাইক্রোবাসে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে মোরশেদ গাড়ি থেকে নেমে দেখতে যান। ঠিক সেই সময় দ্রুতগতির একটি বাস এসে জটলার ওপর উঠে পড়লে ঘটনাস্থলেই মোরশেদসহ তিনজন নিহত হন।
