এপ্রিল কেন ভয়ংকর!



দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ব্যাপক বিস্তারের প্রকাশ ঘটতে পারে চলতি মাসে! সম্প্রতি দুই বিভাগে ১৫ জেলার মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রিফিংকালে করোনা বিস্তারে তিনি এপ্রিলের আশংকার কথা উল্লেখ করেন। এমন একটি আশংকা এখন বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলে। কারণ অনুসন্ধানে কথা হয় চিকিৎসক, সামাজিক গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীর সাথে। তারা বলছেন করোনা ভাইরাস বিস্তারের মাপকাঠিতে আমরা এখন চতুর্থ স্তরে রয়েছে।


কোভিড-১৯ ব্যাপক সংক্রমণরোধে সরকারের পক্ষ হতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। যদিও বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশগুলো ইতোমধ্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে করোনার গতির কাছে।


সম্প্রতি জাতিসংঘ তথ্যকেন্দ্র ‘বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি: প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।


প্রতিবেদনে করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতি বিষয়ক বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মডেলের হিসাবে বলা হয়, বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব ঘটলে এবং তা প্রতিরোধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পাঁচ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাতে পারে।


৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্তের পর সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত ২৬ মার্চ হতে দেশে চলছে সাধারণ ছুটি। ছুটির নামে মূলত চলছে লকডাউন। তবে মানুষ মানছে না কিছুই, ফেনীতে এখনো মানুষের জট দেখা যায় প্রত্যেক সকালে।

 

কোভিড-১৯ আজ অব্দি ফেনীতে শনাক্ত না হলেও দেশে রোগী বাড়ছে জ্যামিতিকহারে। আজকের শেষ খবর পর্যন্ত দেশে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২১ জন, আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩০ জন।


কোভিড-১৯ সংক্রমণের স্তরায়ণ বিষয়ে বিশদ জানান বিএমএ ফেনী জেলা সভাপতি ডাঃ সাহেদুল ইসলাম কাউসার। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ করণীয় হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘরে থাকা।


তিনি বলেন, একজন মানুষ যদি আক্রান্ত হয় এবং সে যদি তার বাসায় থাকে সে ক্ষেত্রে দুটো জিনিস ঘটতে পারে। সে সাধারণ সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে ভালো হয়ে যাবে অথবা সিরিয়াস অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মারা যাবে।


সংক্রমণের প্রথম স্তর হল, বিদেশ থেকে একজন ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত দেশে এসে কোয়ারান্টিনে থাকলো। সুস্থ হল বা হলো না কিন্তু কাউকে আক্রান্ত করল না।


আক্রান্ত ব্যক্তি দেশে এসে পরিবারে ঢুকে পরিবারকে আক্রান্ত করল এবং বাসার আশেপাশে যেখানে সে গেল অথবা যারা তাকে দেখতে এলো সবাই আক্রান্ত হলো। দ্বিতীয় স্তরে এমনটাই ঘটেছে।


আক্রান্ত ব্যক্তিগুলো মসজিদ, বাজার, জনসমাগস্থলে গেল। এই যাওয়ার ফলে দ্বিতীয় ব্যক্তি থেকে তৃতীয় ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছে অর্থাৎ যিনি আক্রান্ত তিনি পরিবারের লোকজনকে করলেন। এখন পরিবারের সদস্য এবং আশপাশের আক্রান্ত লোকরা জনসমাগস্থলে গেল বাজারে গেল সেখানে তারা মানুষকে আক্রান্ত করল। এটাকে বলা হয় লিমিটেড কমিউনিটি ট্রান্সমিশন।


এখন আমরা তৃতীয় থেকে চতুর্থ স্তরে।


এখন কে আক্রান্ত তা জানার দরকার নেই এখন ভাইরাস বাজারে ঘুরছে। আননোন সোর্স থেকে এখন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে অর্থাৎ একজন ব্যক্তি বাজারে গেছেন তিনি জানেন না কোন ব্যক্তি আক্রান্ত, কোন ব্যক্তি আক্রান্ত নয়। এটা হচ্ছে লাস্ট ফেজ অর্থাৎ আননোন ট্রান্সমিশন।


তিনি বলেন, আমরা এখন এমন একটি পর্যায়ে অবস্থান করছি। অথচ এমন পরিস্থিতিরোদে সরকার তার সর্বোচ্চ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার প্রদত্ত ৩১টি পরামর্শেও সামাজিক দুরত্বের কথা বলেছেন, কিন্তু আমরা মানছি না।


কোভিড-১৯ এর আশংকা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এজিএম নিয়াজ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের সামনের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। গত ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে আজ করোনা সংক্রমণের এক মাস হতে চলেছে।


বাংলাদেশ ইতোমধ্যে করোনা সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। চতুর্থ স্তরে পৌঁছে যাওয়া বলতে বুঝায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে যাওয়া। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে। এর ব্যাপকতা হয়তো এখনও কম আছে কিন্তু বাংলাদেশ একটি ঘনবসতি দেশ হওয়ায় এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।


ইতোমধ্যে আমাদের বেশ কিছু ভুল ভ্রান্তি রয়েছে যেগুলোর চড়া মূল্য দিতে হতে পারে আমাদেরকে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের কে দেশব্যাপী বন্ধের মধ্যেও কাজে যোগদান করার সিদ্ধান্ত আমাদেরকে প্রচন্ড ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ঢাকা এবং চট্টগ্রামে আসা-যাওয়ার মধ্যে এই সংক্রমণ কতটা বিস্তার করেছে সেটা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং আমেরিকাতে যেভাবে হোক আমরা দেখতে পাচ্ছি সেইসাথে এই এপ্রিল মাসটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


ইতালিতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রমনের দেড় মাসের মাথায় এর ব্যাপকতা অনেক বেশি বেড়ে গেছে। সংক্রমণের দ্বিতীয় মাসে সেটা কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্স এর উদাহরণ দেখলেই বোঝা যাবে। সেজন্য আমাদের সবাইকে এই পরিস্থিতিকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য সবাইকে বিধি মোতাবেক ঘরে অবস্থান করতে হবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, আক্রান্তদের সেলফ কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে।


ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দেশে মুহূর্তে যারা আক্রান্ত আক্রান্ত হচ্ছেন তারা মূলত বিদেশ থেকে এসেছেন বা সরাসরি কোভিড-১৯ ক্যারিয়ার নয়। এরা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে বা কোথাও না কোথাও থেকে ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় আক্রান্ত রোগী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। নারায়ণগঞ্জের বিষয়টি কয়েকদিন আগেও আলোচিত ছিল না। এক দুইজন করে এখন সংখ্যাটা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে।


এ মাসে পি টু পি ট্রান্সমিশন ফুটে উঠেছে তাই যত বেশি টেস্ট করা হবে তত বেশি আক্রান্ত সংখ্যা বাড়তে থাকবে।


তিনি বলেন, এই মুহূর্তে এক ঘরে আবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। এখনো সময় আছে এখনো মানুষকে ঘরে থাকা উচিত যে কোন কিছুর মূল্যে এবং প্রতিটা জায়গাতে মানুষজন বের না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। নারায়ণগঞ্জের কিছু মানুষ ভয়ে ফেনী চলে আসছে এখন তাদের মধ্যে কেউ যদি আক্রান্ত থেকে থাকেন তবে শেষ পর্যন্ত করবে তবে আক্রান্ত করবেন।


বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সিনিয়র সাব এডিটর তানভীর আলাদিন বলেন, বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চীনের কয়েকজন বিশেষজ্ঞসহ দেশের একাধিক গবেষক টেলি কনফারেন্সে মিলিত হয়েছেন। সেখানে বিদেশীদের পক্ষ হতে বলা হয়েছে, বাঁচার পথ একটিই- ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন এবং ঘরে থাকুন। যত পারেন টেস্ট করুন, শনাক্ত করুন, আক্রান্তদের সরিয়ে নিন।


বাংলাদেশে কোভিড-১৯ শনাক্তের একমাস পূর্ণ হয়েছে। আমাদের সামনে বিশ্বের যে উদাহরণ রয়েছে, সর্বত্র দ্বিতীয় মাসে করোনাভাইরাস প্রলয় চালিয়েছে। আমরা এখন সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে রয়েছি। জানি না কে সুস্থ কে আক্রান্ত। এমন একটি অনিশ্চয়তা চলবে মাসজুড়ে এবং আক্রান্ত মানুষদের প্রকাশ ঘটবে এ রোগের সাধারণ নিয়মে।


বাঁচতে হলে ঘরে থাকতে হবে। ঘরে খাবার থাকুক বা না থাকুক। কারন আক্রান্ত ব্যক্তি যদি নিজের অবস্থা না জেনে আরও দশজনকে আক্রান্ত করেন তবে কারও সুস্থ থাকার পথ থাকবে না।

 

মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন

    কোনো মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় নি

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।