কিশোর বয়সে গ্যারেজে কাজ করার সুযোগে আগ্রহী হয়ে উঠেন নতুন কিছু উদ্ভাবনের। তৈরি করছেন ইট-পাথর ভাঙার মেশিন। আলাদা যন্ত্রাংশ কিনে এনে স্থাপন করেছিলেন ‘সততা অয়েল মিল’। স্বপ্ন ছিল কিছু আলাদা করার, চেষ্টা ছিল নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু সেই চেষ্টাই হয়ে গেল জীবনের শেষ গল্প। কথাগুলো বলছিলেন ইউটিউব দেখে বিকল্প উপায়ে অকটেন তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে নিহত নুর আলম মাসুদের ছেলে নুর হোসেন রিহান (১৮) এবং স্থানীয় এলাকাবাসী।
তারা জানান, ছোটবেলা থেকেই উদ্যোমী এবং কর্মঠ ছিলেন নুর আলম মাসুদ। কিশোর বয়সে স্থানীয় একটি গ্যারেজে কাজের হাতেখড়ি। পরে নিজের চেষ্টায় একের পর এক যন্ত্রাংশের দোকান, পিকআপ ব্যবসা, ইট-বালুর ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। এসব ব্যবসায় বাকি দেওয়াসহ নানা কারণে লোকসানে পড়েন। সবশেষে নজরুল প্রাথমিক এলাকায় বক্স আলি ভূঞা জামে মসজিদের জায়গা ভাড়া নিয়ে গরুর খামার এবং ‘সততা অয়েল মিল’ নামের তেল প্রক্রিয়াজাত করার একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এখানেই তিনি নানা রকমের উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যান। ইট-পাথর ভাঙার মেশিন, স্প্রিং চেয়ার ও স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ার নিজের চেষ্টায় তৈরি করে তিনি সফলও হয়েছিলেন। পরে একই অয়েল মিলে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও পলিথিন পুড়িয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে তৈরি করতে চেয়েছিলেন জ্বালানি পদার্থ অকটেন। গত ২ বছর ধরে তিনি অকটেন তৈরির চেষ্টা করলেও বিগত ৩/৪ মাস করেছেন কঠোর পরিশ্রম। গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকেলে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করলে হঠাৎ একটি পাইপ বিস্ফোরিত হয়ে দুই হাত এবং কোমরের নিচের বেশিভাগ শরীর পুড়ে ঝলসে যায়। একই সঙ্গে দগ্ধ হন তার সহকারী মো. ওমর ফারুকও।
নিহত নুর আলম মাসুদের ছেলে নুর হোসেন রিহান বলেন, আমার বাবা অনেক আগ থেকেই উদ্ভাবনে বেশ আগ্রহী। সম্প্রতি ইউটিউব দেখে প্লাস্টিক ও পলিথিন পুড়িয়ে সাশ্রয়ী মূল্যের অকটেন তৈরি করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনায় পড়েন। এর আগেও অনেক কিছু তৈরি করেছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা একরামুল হক বলেন, বিস্ফোরণের পর আমরা দৌড়ে এসে দেখি নুর আলম মাসুদ এবং তার সহকারী মো. ওমর ফারুকের শরীর আগুনে দগ্ধ হয়ে গেছে। এরপর মাসুদের মনোবল শক্ত ছিল। দগ্ধ হওয়ার পরপরই নিজের হাতে গায়ে ঠান্ডা পানি ছিটিয়েছেন। পরে নিজে হেঁটে রিকশায় উঠে সোনাগাজী হাসপাতালে যান। উদ্ভাবনের নেশা তার ছোটবেলা থেকে, এই নেশার কারণেই শেষ প্রাণ হারালেন তিনি।
নিহতের ছোট ভাই মোর্শেদ আলম রাসেল জানান, আমার ভাই একজন দক্ষ ওয়েল্ডার ছিলেন। নতুন নতুন উদ্ভাবন নিয়ে তিনি সবসময় কাজ করতেন। এর আগেও তিনি স্প্রিং চেয়ার ও স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ার তৈরি করে এলাকায় সাড়া ফেলেছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল কম খরচে অকটেন উৎপাদন করে মানুষের জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা। কিন্তু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় পাইপ বিস্ফোরিত হয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও জানান, নুর আলমের মরদেহ ঢাকা থেকে তার গ্রামের বাড়িতে আনা হচ্ছে। রাত ১১টায় তার নিজ বাড়িতে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তার সহকর্মী আহত মো. ওমর ফারুক বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেনেছি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ওই ব্যক্তি পরীক্ষামূলকভাবে অকটেন তৈরি করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা তার বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দাহ্য পদার্থ উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণে যথাযথ লাইসেন্স, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কারিগরি তদারকি না থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে-এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
মৃত্যুর কাছে হার মানলেন তিনি
সোনাগাজীতে ইউটিউব দেখে বিকল্প উপায়ে অকটেন তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়া নুর আলম মাসুদকে বাঁচানো গেল না। গতকাল শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মাসুদ সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের ওমর খান পাঠান বাড়ির মৃত খুরশিদ আলমের ছেলে। তিনি পৌরসভার নজরুল প্রাইমারি এলাকায় সাহাব উদ্দিনের নতুন বাড়িতে বসবাস করতেন। পরিবারে পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ছিলেন।
নিহতের স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকেলে সোনাগাজী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নজরুল প্রাইমারি এলাকায় বিকল্প পদ্ধতিতে অকটেন তৈরির সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে একটি পাইপ বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এতে গুরুতর দগ্ধ হন নুর আলম মাসুদ ও তার সহকর্মী মো. ওমর ফারুক। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। চারদিন সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়েছে।
রেজাউল করিম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মাসুদ অত্যন্ত বিনয়ী ও সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয় ছিলেন। এই দুর্ঘটনার আগের রাতেও নজরুল প্রাথমিক যুব সমাজের উদ্যোগে মাহফিল আয়োজনের সভায় উপস্থিত ছিলেন। তার এমন আকস্মিক চলে যাওয়াতে সমাজের সকলে শোকাহত।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক জিয়া উদ্দিন হৃদয় বলেন, আমরা প্রায় সময়ই দেখতাম তিনি ইউটিউব দেখে দেখে নতুন কিছু উদ্ভাবনের চেষ্টা করতেন। সম্প্রতি অকটেন তৈরির একটি পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনার শিকার হন। হঠাৎ বিস্ফোরণে আহত হয়ে এমন মৃত্যুর সংবাদে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহতের ভাই মোর্শেদ বলেন, আমার ভাই নতুন একটি পদ্ধতিতে অকটেন তৈরির কাজ করছিলেন। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পাইপ বিস্ফোরিত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এ ব্যাপারে সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুর রহমান বলেন, বিস্ফোরণের পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আহত ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়টি অবগত হয়েছি। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
