মে দিবস শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু ফুলগাজীর ইটভাটার শ্রমিকদের কাছে দিনটি যেন কোনো আলাদা অর্থ বহন করে না। আকাশে মেঘ থাকলেও তাদের জীবনের কষ্টের তাপ কমে না একটুও। শুক্রবার (১ মে) সকালে ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের বিসমিল্লাহ ব্রিকস ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক বাস্তবতা। ধূসর মেঘে ঢেকে থাকা আকাশ সূর্যের তীব্রতা কম থাকলেও ইটভাটার চুল্লীর আগুন, ধুলোবালি আর ক্লান্তিকর শ্রমে সেই স্বস্তির ছোঁয়া পৌঁছায় না শ্রমিকদের জীবনে।

ভাটার ভেতরে কেউ কাঁধে কাঁচা ইট বহন করছেন, কেউ ব্যস্ত ইট সাজাতে, কেউবা চুল্লীতে কয়লা দিচ্ছেন। শরীর ঘামে ভেজা, ধুলোয় মাখামাখি। শুক্রবার জুম্মা নামাজের জন্য প্রস্তুতি, দুপুরের খাবারের জন্য পালাক্রমে পাশের অস্থায়ী ঘরে যাচ্ছেন তারা। বিশ্রাম বলতে প্রায় কিছুই নেই।

লক্ষ্মীপুর থেকে আসা শ্রমিক ইরান বলেন, শ্রমিক দিবস দিয়ে কী করবো? পেট তো বোঝে না। কাজ করতেই হবে।

শ্রমিক দলের সুপারভাইজার রংপুরে সুকুমার জানান, এখানে কেউ মে দিবস নিয়ে ভাবে না। সবাই শুধু জানে। একদিন কাজ বন্ধ মানেই আয় বন্ধ।

একই সুর শোনা যায় অন্যদের কণ্ঠেও। নোয়াখালীর কামাল ও নুরে আলম বলেন, আমাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা, অনেক সময় রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তারপরও যে মজুরি পাই, এতে নিজেরই চলে না, পরিবার চলবে কেমন করে?

নেত্রকোনা থেকে আসা এক শ্রমিক বলেন, কাগজে-কলমে অনেক অধিকার আছে, কিন্তু বাস্তবে আমরা সেগুলোর কিছুই পাই না। আমাদের কথা বলার জায়গা নেই।

ফুলগাজীর আনন্দপুর, মুন্সীরহাট ও জিএমহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন ইটভাটায় স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা নেত্রকোনা, রংপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ নানা এলাকা থেকে আসা শত শত শ্রমিক কাজ করছেন। অধিকাংশই জানেন না মে দিবসের ইতিহাস বা তাৎপর্য; তাদের কাছে দিনটি কেবল আরেকটি কর্মদিবস।

বিসমিল্লাহ ব্রিকস-এর ম্যানেজার দিদার শ্রমিকদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বে শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত মর্যাদা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শ্রমিকের ঘাম দিয়েই সবকিছু দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ তাদের কথাই সবচেয়ে কম শোনা হয়। তিনি বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থা বোঝা এবং তাদের কথা শোনা এখন সময়ের দাবি।

অন্যদিকে ইটভাটা মালিকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন বিসমিল্লাহ ব্রিকস-এর স্বত্বাধিকারী রাব্বি। তিনি বলেন, আমরা শ্রমিকদের অধিকারকে সম্মান করি। প্রতি বছর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসে ইটভাটা বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে অধিকাংশ কার্যক্রম সর্দারদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শ্রমিক নিয়োগ, মজুরি ও ছুটির বিষয়গুলোও তারাই দেখেন। সর্দাররা এ বন্ধ রাখতে চায় না, কারণ বন্ধ থাকলে তাদের আয়ের সমস্যা হবে ভেবে কাজ চালিয়ে যায়।

তিনি আরও জানান, ইটভাটার কাজ অনেকটাই চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় সব কিছু সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা সবসময় সম্ভব হয় না।

উল্লেখ্য, ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস সরকারি ছুটির দিন হলেও এ বছর দিনটি শুক্রবার হওয়ায় অনেক ভাটায় কাজের স্বাভাবিক ধারায় তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। মেঘলা আকাশে সূর্য আড়ালে থাকলেও ফুলগাজীর ইটভাটার শ্রমিকদের জীবনে লুকিয়ে নেই কোনো কষ্ট। মে দিবস আসে, আবার চলে যায় কিন্তু তাদের বাস্তবতা বদলায় না। অধিকার, সম্মান আর নিরাপত্তা, এই শব্দগুলো তাদের কাছে এখনো অধরা। তাদের প্রতিদিনের একটাই সত্য কাজ করতে হবে, নাহলে চলবে না।