ধান কাটার মৌসুমের মাঝেই টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে আগাম বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে ফুলগাজীতে। এতে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান নুয়ে পড়ে মাঠেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে না পারলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গত চার দিনের টানা বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ধান নুয়ে পড়েছে। অনেক জমিতে পানি জমে ধান ভিজে গেছে। ফলে ধান কাটা ও শুকানো দুটোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, মোট আবাদকৃত জমির তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ এখনও সীমিত। তবে আবহাওয়া পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে পারে।
টানা বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে থাকায় অনেক কৃষক নিজেরাই পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথ বাধাগ্রস্ত থাকায় কার্যকর ফল মিলছে না। এতে করে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ফসলের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
দৌলতপুরের কৃষক হোসেন বলেন, আগে এক একর জমিতে প্রায় ৪০ মণ ধান পেতাম, এখন ৩০ মণও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। ঝড়-বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মুন্সীরহাটের কৃষক ইউনুস বলেন, ধান পুরো নুয়ে পড়েছে, পানিতে ভিজে গেছে। দ্রুত পানি না সরলে সব শেষ হয়ে যাবে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৪৭১৯ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৭৭ হেক্টরের ধান কাটা হয়েছে, বাকি রয়েছে ৪৩৪২ হেক্টর। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ হেক্টর জমির ধান নুয়ে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ খোরশেদ আলম জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য কাজ চলছে। তবে উজানে বৃষ্টি বাড়লে নদীর বাঁধ ভেঙে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন,আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। কিন্তু বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।
ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ফুলগাজী ইউনিয়নে ১৩৭৪ হেক্টর, মুন্সীরহাটে ৯৮৪, দরবারপুরে ৭০০, আনন্দপুরে ৫৭০, আমজাদহাটে ৩৫১ এবং জিএমহাটে ৭৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকেরা দ্রুত সরকারি সহায়তা, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো মেরামতের দাবি জানিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিনমজুররা
টানা বৃষ্টিতে যেন থমকে গেছে ফুলগাজী উপজেলার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সকাল থেকে আকাশের মেঘ আর অবিরাম বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে কর্মস্থল, স্কুল কিংবা জীবিকার খোঁজে বের হতে হয়েছে মানুষকে। তবে এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ, বিশেষ করে দিনমজুররা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়কজুড়ে জমে থাকা পানি আর পিচ্ছিল পথে চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ। ফুলগাজী সদর, মুন্সীরহাট ও নতুন মুন্সীরহাট এলাকায় দেখা যায়, অনেকে ছাতা হাতে, আবার কেউ ভিজেই গন্তব্যে ছুটছেন। গণপরিবহন কম থাকায় বাস ও সিএনজি স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগ আর বিরক্তি। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গাড়ি না পেয়ে হেঁটেই রওনা হয়েছেন।
তবে সবচেয়ে কষ্টের চিত্র দেখা গেছে শ্রমবাজারগুলোতে। প্রতিদিনের মতো কাজের আশায় বের হলেও বৃষ্টির কারণে কাজ মেলেনি অনেকের।
করিম নামের এক দিনমজুর বলেন, সকাল থেকে বসে আছি, কেউ কাজে নেয় না। আজকের আয় বন্ধ। বাসায় গেলে বাচ্চাদের কী খাওয়াবো বুঝতে পারছি না।
শিক্ষার্থীরাও পড়েছেন বিপাকে। ভিজে কাপড়েই অনেককে স্কুল-কলেজে যেতে হয়েছে। কেউ কেউ আবার বৃষ্টির তীব্রতায় দেরিতে বের হয়ে সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি।
ফেনীতে কর্মরত রাশেদ বলেন, সকাল থেকেই ঝামেলায় পড়েছি। রাস্তায় পানি, গাড়ি নেই, অফিসে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে গেছে।
এদিকে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও ঝড়ে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। স্থানীয়রা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় পানি তোলা, খাবার সংরক্ষণ সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের গরমের পর বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও ফুলগাজীর মানুষের কাছে তা যেন নতুন দুর্ভোগের নাম হয়ে উঠেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার প্রবণতা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
