ফেনী শহরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বড় বাজার ও দীর্ঘদিন ধরেই চরম অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। বাজারটিতে অগ্নি নিরাপত্তায় রিজার্ভ পানির ট্যাংক নির্মাণ কাজ চললেও তবু বিপদের শঙ্কা পুরোপুরি কাটছে না। ফায়ার সেফটি প্ল্যান না মানা, অপরিকল্পিত স্থাপনা, সংকীর্ণ গলি, অপর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম এবং পানির সংকটে অগ্নি দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়ে গেছে বাজারটিতে।

ফেনী পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা বাড়াতে বড় বাজারের নারিকেল পট্টি সড়কে ১ লাখ ৩২ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি রিজার্ভ পানির ট্যাংক নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়েছে। ট্যাংকটির দৈর্ঘ্য ১২ মিটার ও প্রস্থ ৫ মিটার। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। জায়গার অভাবে রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণে দেরি হয়েছে।

এ ব্যাপারে ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল জানান, ফেনী বড় বাজারে কয়েকটি পুকুর ছিল। সেগুলো ভরাট করে ফেলায় পানির কোন উৎস বাজারে নেই। আগুন লাগলে পানির অভাবে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। এজন্য পানির সংরক্ষণে রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণ করা হচ্ছে। বেশ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে আরও কয়েকটি রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণ করা লাগবে।

এ ব্যাপারে ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির উদ্দিন দৈনিক ফেনীকে জানান, ফেনী বড় বাজারে অগ্নি দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে ফেনী পৌরসভার অর্থায়নে পানির রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণ করা হচ্ছে।

নির্মাণ কাজের দেখভাল করছেন ফেনী পৌরসভার উপ সহকারি প্রকৌশলী বিপ্লব দেবনাথ। তিনি জানান, এ নির্মাণ কাজে ২১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তালুকদার এন্টারপ্রাইজ কাজটি বাস্তবায়ন করছে। রিজার্ভ ট্যাংকটি পৌরসভার পানি সরবরাহ লাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বড় বাজার ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার দোকান রয়েছে। এসব দোকান ও স্থাপনায় আনুমানিক ৬০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে, যা বর্তমানে ঝুঁকির মুখে। অথচ বাজার জুড়ে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

ফেনী ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহাদাত হোসেন জানান, তিনি রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণের বিষয়ে কিছু জানেন না। এটি নির্মাণের আগে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে পরামর্শ করার দরকার ছিল। কারণ এটি অগ্নি নির্বাপনের কাজে ব্যবহার করা হবে। তাই এর কার্যকারিতা সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের নির্মাণের আগে অবগত করতে হবে।

তবে এ প্রসঙ্গে ফেনী পৌরসভার উপ সহকারি প্রকৌশলী বিপ্লব দেবনাথ বলেন, ফায়ার সার্ভিসের নকশা অনুযায়ী রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে নির্মাণ কাজ শুরুর আগে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। ব্যবসায়ীদের আপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি নির্মাণের সময় ব্যবসায়ীদের সাময়িক অসুবিধা হলেও এর সুফল তারাই পাবেন। এর কার্যকারিতা ফলপ্রসূ হলে ভবিষ্যতে আরও রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা বলছেন, অগ্নিঝুঁকির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অধিকাংশ দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র না থাকা, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ, সরু গলি এবং জলাশয় না থাকা। অগ্নিকাণ্ডের সময় এসব কারণে দমকল বাহিনীর কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে বড় বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু বড় বাজারেই প্রায় ৯ হাজার থেকে সাড়ে ৯ হাজার দোকান রয়েছে। এসব দোকানে কার্যকর কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। বাজারে ব্যবসায়ীদের পুঁজি ও অবকাঠামো মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের বড় অঙ্কের বিনিয়োগও জড়িত।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের প্রধান সড়কগুলো তুলনামূলক প্রশস্ত হলেও অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। এতে পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশে বাধার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বহুতল ভবনের নকশায় রিজার্ভ পানির ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ভবনে তা নেই। সরু সিঁড়ি ও ফায়ার সেফটি প্ল্যান না মানায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটলে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, পুরো জেলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

বড় বাজার নিয়ে ফেনী ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, বড় বাজারের আশপাশে কোনো পানির উৎস নেই। ফায়ার সেফটি প্ল্যানের নিয়ম অনুযায়ী যেখানে প্রতিটি দোকানে অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র থাকার কথা, সেখানে বাজার জুড়ে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ ব্যবস্থা আছে। কোনো বাণিজ্যিক ভবন যদি একতলাও হয় সেখানে সব রকমের সেফটি প্ল্যান মেনে ভবন তৈরি করতে হবে। অথচ ঠিক উল্টো চিত্র ফেনী বড় বাজারে। এতে করে অগ্নি ঝুঁকির মধ্যে সবার শীর্ষে আছে বাজারটি।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় বাজার এলাকায় অন্তত তিনটি রিজার্ভ পানির ট্যাংক প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিটি দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ অপসারণ এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যান বাস্তবায়ন জরুরি।

উল্লেখ্য, গত ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর বড় বাজারে ধানপট্টিতে মেসার্স আলম এন্টারপ্রাইজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে বড় বাজারে জুতা দোকানে আগুন লাগে। একই বছরে সওদাগর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে ১০টি দোকান এবং ২০২১ সালের একই টাওয়ারে ১২টি আগুনে পুড়ে যায়। এর আগে ২০১৮ সালের ৪ জুন ফেনী শহরের ট্রাংক রোডে একটি হার্ডওয়্যার দোকানে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান এক দোকানকর্মী। ওই ঘটনায় পর্যাপ্ত পানির অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বড় বাজার যেকোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হতে পারে।