শহরের মিজান রোডের টাউন হল মাঠে বসেছে তাঁতবস্ত্র ও হস্তশিল্প মেলা প্রদর্শনী ২০২৬। গতকাল বুধবার (১৫ এপ্রিল) এ মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কার্যালয় হতে মেলা আয়োজনের অনুমতিপত্র অনুযায়ী এ মেলা চলবে আগামী ৫ মে পর্যন্ত।

বাঙালি সংস্কৃতিতে মেলা একটি আনন্দ-উৎসবের বিষয় হলেও ফেনীতে এ ধরনের মেলার বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থাকেন ব্যবসায়ীরা। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এ মেলার অনুমোদন না দিতে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেছিল ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতি। ব্যবসায়ীদের বাধা স্বত্ত্বেও এই মেলার অনুমোদনের কারণ এবং উদ্দেশ্য জানতে জেলা প্রশাসক মনিরা হককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

মেলার আয়োজক এএসটি কর্পোরশেন বরাবর গত ১৩ এপ্রিল জেলা প্রশাসনের জুডিসিয়াল মুন্সিখানার সহকারী কমিশনার স্বাক্ষরিত অনুমতিপত্রে ১৭টি শর্ত উল্লেখ করা হয়। এরমধ্যে ৪ নম্বর শর্তে রয়েছে, “তাঁত, বস্ত্র ও হস্তশিল্প পণ্য ব্যতিত অন্য কোন বিদেশী পণ্য রাখা যাবে না।”

মেলা বন্ধে গত ২ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কাছে ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক আলাল উদ্দিন আলাল স্বাক্ষরিত আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, “ফেনীতে প্রতি কয়েক মাস অন্তর অন্তর বিভিন্ন রকমের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে করে ফেনীর যেসকল ব্যবসায়ীবৃন্দ আছেন তারা লোকসানের মুখে পড়েন। উক্ত মেলায় মানহীন পণ্য বিক্রিসহ ফেনীর কোন স্থানীয় ব্যবসায়ী অংশগ্রহণ বা কোনপ্রকার স্টল নিতে পারেন না। যারাই উক্ত মেলাগুলোতে স্টল ভাড়া নেন তারা সবাই বহিরাগত ব্যবসায়ী। কিন্তু ফেনী জেলার যেসকল স্থানীয় ব্যবসায়ী নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদান করে আসছেন তাদের ব্যবসা এখন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। ফেনী শহরে ব্যবসায়ীদের জন্য এই কথিত মেলা খুবই হুমকি স্বরূপ।”

মেলার আয়োজককে জেলা প্রশাসনের অনুমতিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রোপ্রাইটর, এএসটি কর্পোরশেন এর আবেদন ও পুলিশ সুপার, ডিএসবি, ফেনী’র প্রতিবেদনের আলোকে মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মেলার অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশ কোন কোন দিক বিবেচনার প্রেক্ষিতে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়ে থাকে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে বলেন, মেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত প্রতিবেদন পুলিশ দিয়ে থাকে। মেলার অনুমোদন দেওয়ার জন্য যেসব শর্ত রয়েছে তার মধ্যে এটি একটি মাত্র। সকল শর্ত বিবেচনা করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিষয়টি দেখে থাকেন। 

উল্লেখ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে এ মেলা আয়োজনের অনুমতি প্রদানে একটি চিঠি দৈনিক ফেনীর হাতে এসেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-৭ শাখায় দায়িত্বরত উপসচিব মো. সাজেবুর রহমান স্বাক্ষরিত পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, “মেলা পরিপত্র-২০২৪, অনুযায়ী জেলা পর্যায়ের স্থানীয় মেলা আয়োজনের অনুমতি প্রদান জেলা প্রশাসকের এখতিয়ার। ফেনীর শহিদ জহির রায়হান হল মাঠে ফেনী তাঁত, বস্ত্র ও হস্তশিল্প মেলার আয়োজন অনুমতি প্রদানের বিষয়ে স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।” বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ পত্রটি ফেনী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবার পাঠানো হয়েছে।

গতকাল মেলার প্রথমদিনে বিভিন্ন স্টলে ঘুরে দেখা গেছে, মেলায় তাঁত, বস্ত্র ও হস্তশিল্পের পণ্য তেমন দেখা যায়নি। প্লাস্টিক সামগ্রী, ঘর-গেরস্থালির পণ্য, কসমেটিকস সামগ্রী, চশমা, নারীদের বিভিন্ন সামগ্রী, চাইনীজ পণ্য, ইলেকট্রিক সামগ্রী, বাচ্চাদের খেলনা, ও বিভিন্ন খাবারের দোকান রয়েছে। মেলায় এক বিক্রেতা জানান, চায়না পণ্য রয়েছে বেশি।

শহরের গ্র্যান্ড হক টাওয়ারের পরিচালক ইমন-উল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বন্যা, আন্দোলন সংগ্রামে ফেনীর ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত। এক বছর পরপর আয়োজিত এ মেলা ফেনীর ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতিকারক। নামে তাঁত ও বস্ত্র মেলা হলেও এতে এ ধরনের কোন পণ্য নেই। তারা চাইনীজ ও বিভিন্ন নিম্নমানের পণ্য এনে বিক্রি করছে। ফেনীবাসীকে ঠকিয়ে টাকা কামিয়ে তারা চলে যাচ্ছে।

মেলার নাম তাঁত, বস্ত্র ও হস্তশিল্প হলেও এতে মানহীন পণ্যের বেচাবিক্রি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এএসটি কর্পোরশেনের পরিচালক হেলাল উদ্দিন দৈনিক ফেনীকে জানান, তাঁত ও বস্ত্রের পণ্য মেলায় রয়েছে। তবে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও মানহীন কোন পণ্য বিক্রি হয় না। মেলায় দেশী ও বিদেশী উন্নতমানের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। মাসখানেক অনুমোদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেলার প্রস্তুতিতেই দশ দিন সময় চলে যায়। যার কারণে মাসখানেক মেলা না চললে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরও জানান, মেলার মাঠ জেলা পরিষদ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন দিয়েছে জেলা প্রশাসন।