আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জমজমাট বেচাকেনায় মুখরিত ফেনীর বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমল। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ক্রেতাদের ভিড়। বিশেষ করে বড় বাজার, শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক ও কলেজ রোড এলাকায় কেনাকাটার জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) শহরের বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও শপিংমল ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিগত দুই বছরের তুলনায় এবার বেচাকেনা বেশ ভালো। চলতি ঈদ মৌসুমে জেলায় প্রায় ১২শ থেকে ১৩শ কোটি টাকার বেচাবিক্রির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন ফেনীর বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতারা।
সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত শপিংমলগুলোতে চলছে বেচাকেনার ধুম। ক্রেতারা ব্র্যান্ড নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় দোকান থেকেও কেনাকাটা করছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে প্রতিবার ব্র্যান্ড শপগুলোর নির্ভরতায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বেচাবিক্রিতে কিছুটা প্রভাব পড়লেও এবারের চিত্র ভিন্ন। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, এবার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বেচাবিক্রি অন্যান্য বছরের তুলনায় ভালো। ব্র্যান্ড শপগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ঈদের বাজার ভালো ধরেছে বলে মনে করছেন একাধিক ক্রেতা-বিক্রেতা।
বড় বাজারের এলাহি কর্নারের ব্যবসায়ী রতন বলেন, যতই ব্র্যান্ডের দোকান আসুক বড় বাজারের বেচাবিক্রিকে টক্কা দিতে পারবে না। এবার বেচাবিক্রি অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক ভালো। শুরুর দিকে একটু কম থাকলেও এখন বেচাবিক্রি বেড়েছে। সরকার পতনের পর ব্যবসার যে স্থবিরতা ছিল, বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছিল সেটি এবার ব্যবসায়ীরা পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে মনে করছেন তিনি।
ফেনী গ্র্যান্ড হক টাওয়ারের পরিচালক ব্যবসায়ী ইমন উল হক বলেন, ক্রেতাদের মধ্যে ব্র্যান্ড নির্ভরতা রয়েছে। কারণ ঈদের সময় সবাই একটু দামি পাঞ্জাবি বা ব্যতিক্রমী পোশাক পরতে চায়। সেজন্য অনেকেই ব্র্যান্ড শপগুলোতে ভিড় করেন। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ঈদকে কেন্দ্র করে ভালো ভালো পণ্য নিয়ে আসেন। তাই তাদেরও ভালো বেচাবিক্রির আশা থাকে।
তিনি আরও বলেন, ফেনীর উপজেলা শহরগুলোতে শপিংমল গড়ে ওঠায় শহরে মানুষের চাপ কিছুটা কমেছে। তবে বেচাবিক্রি রয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও ১২শ থেকে ১৩শ কোটি টাকার বেচাবিক্রি হতে পারে বলে আশা করছি।
শহীদ হোসেন উদ্দিন বিপণি বিতান ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি একেএম আবদুল্লাহ জিন্নাহ বলেন, এটি শহরের পুরোনো মার্কেট। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালোই রয়েছে। মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত। অন্যান্য বছরের তুলনায় বেচাবিক্রি ভালো।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা আসা কিছুটা কমে যাওয়ায় ব্যবসায় ভাটা পড়েছিল। তবে সেটি কেটে গেছে। কারণ ফেনীর মানুষ শৌখিন। ঈদ এলে ধারদেনা করে হলেও কেনাকাটা করেন। সারাদেশের চেয়ে ফেনীর কেনাকাটার ধরন কিছুটা আলাদা।
তিনি আরও বলেন, কেনাকাটায় ব্র্যান্ড নির্ভরতা ৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে থাকলেও ৯৫ শতাংশ মানুষ স্থানীয় মার্কেট থেকেই কেনাকাটা করে। বন্যার ক্ষতি ও সরকার পতনের সময়কার স্থবিরতা ব্যবসায়ীরা কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে আশা করেন তিনি।
শহর ব্যবসায়ী সমিতির আহবায়ক আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, এবার ভোগ্যপণ্য স্মরণীয় বেচাবিক্রি হচ্ছে। দাম সহনশীল হওয়াতে গত কয়েক দশকে সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছে। ঈদের পণ্যের ক্ষেত্রেও বড় বাজারসহ শপিংমলগুলোতে ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। শুধুমাত্র পাইকারি পণ্যেই হাজারকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সবমিলিয়ে ঈদের বেচাবিক্রি ১২০০ থেকে ১৩০০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। ব্যবসায়ীরা ভালো বেচাবিক্রি করছে, তবে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় টহল পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে। বাজারের ভেতরে কমিউনিটি ট্রাফিক পুলিশিং ব্যবস্থা রয়েছে। শৃঙ্খলা রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক রাতে নাইট গার্ডরাও দায়িত্ব পালন করছে। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরে যানজটও বেড়েছে। বিশেষ করে শহরের বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের চাপ লক্ষ্য করা গেছে। এক সড়ক থেকে অন্য সড়কে যেতে যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এসব এলাকায় ব্যস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি মার্কেটগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
বাজারে উপচে পড়া ভিড়
শহর বিভিন্ন শপিং মল ও বিপনী বিতান ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে জমে উঠেছে শহরের অন্যতম ব্যস্ত পোশাক বিপণিবিতান এলাকা কলেজ রোডস্থ গার্ডেন সিটি, শহীদ হোসেন উদ্দিন বিপণি বিতান, গ্র্যান্ড হক টাওয়ারসহ আশেপাশের বিভিন্ন মার্কেট। অন্যদিকে ফেনী বড় বাজার, শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কে অবস্থিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুম, আশেপাশের শপিংমল, মার্কেট ও ফুটপাতের দোকানগুলোতেও ক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
বিশেষ করে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও শিশুদের সামগ্রীর দোকানগুলোতে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। রঙিন বাতিতে সাজানো হয়েছে এসব শপিংমল ও বিপণিবিতান। সকাল থেকে ফেনী বড় বাজারে মানুষের জনসমাগম বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে সন্ধ্যার পর থেকে শপিংমল ও ব্র্যান্ড শোরুমগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন। আবার কেউ কেউ এসেছেন বন্ধুদের সঙ্গে। পাশাপাশি সাধারণ দোকান ও ফুটপাতের দোকানগুলোতেও মানুষের ভিড় বেশ লক্ষ্য করা গেছে। কেউ দেখছেন, আবার কেউ কিনছেন।
কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতা সাহেদুল ইসলাম বলেন, অফিস ও অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে আগে কেনাকাটা করতে পারিনি। তাই রাতে স্ত্রীকে নিয়ে মার্কেটে এসেছি। এখনই অনেক ভিড়। সামনে আরও বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে। মার্কেটগুলোতে ভালো ভালো কালেকশন রয়েছে। দাম কিছুটা বেশি হলেও পছন্দনীয় পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত ক্রেতাদের বেশ সমাগম রয়েছে। রমজান মাস জুড়ে ভালোই বিক্রি হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি এমন থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন তারা।
রাকিবুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, ফেনীতে নামি-দামি সব ব্র্যান্ডের শোরুম রয়েছে, যেগুলোর ঢাকা-চট্টগ্রামে বেশ সুনাম রয়েছে। নিজ জেলায় যখন এমন প্রতিষ্ঠান থাকে, মানুষ কৌতূহল থেকেই কেনাকাটা করে। ফলে ব্র্যান্ড শপগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকেও ক্রয় করে। ফেনীর বহু মানুষের প্রথম পছন্দ শহীদ মার্কেট কিংবা বড় বাজার।
