ঝুঁকিপূর্ণ সাহেবেরঘাট সেতু, বন্ধ সংস্কার ও যানচলাচল
দুই বছর ধরে ছোট ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সাহেবেরঘাট সেতুর সংযোগস্থলে বারবার সংস্কার করেও যানচলাচল নির্বিঘ্ন করতে পারছে না সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ঝুঁকি বিবেচনায় সেতুর ওপর ভারী যানচলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে ফেনী ও নোয়াখালী জেলা প্রশাসন।নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিন দৈনিক ফেনীকে বলেন, ভারী গাড়ি চলাচলে ফেনীর প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যারিয়ার দেওয়া আছে। বর্ষায় পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় সংস্কারকাজ চলমান রাখা সম্ভব হয়নি। পানির স্তর কমে গেলে আবার সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।তিনি আরও জানান, নদীর একদিকে চর জেগে ওঠায় বিপরীত পাশে প্রবাহিত পানি এসে আঘাত করছে, এতেই বিপত্তি হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে আমরা একপাশে কাজ শুরু করতে পেরেছিলাম। এজন্য অন্যপাশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। যেহেতু ভারী যানচলাচল না করায় ছোট যানচলাচলে চাপ পড়বে না।স্থায়ী সমাধান নিয়ে সওজের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে জিও টিউব দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে শিট পাইল দেওয়া হয়েছে। শিট পাইলের ভেতরে আরসিসি পাইলিং এবং সিসি ব্লক দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, এর মধ্য দিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে। পানির স্তর কমে গেলে ডিসেম্বর মাসে কাজ শুরু হবে আশা করা যায়।স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম খলিল ছিদ্দিকি বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে ব্রিজের ওপর দিয়ে ভারী যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। ব্রিজের দুই পাশের মাটি জোয়ারের কারণে সরে গেছে এবং ব্রিজ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।মোস্তফা নামে স্থানীয় এক মাদ্রাসাশিক্ষক জানান, ব্রিজের ভাঙা অংশের সংস্কারকাজ দুই সপ্তাহ পর্যন্ত চলমান ছিল। তখন কিছু বালুর বস্তা দিয়ে ভরাট করে ব্রিজের ভাঙা অংশে দেওয়া হয়েছিল। ভাঙা অংশে কয়েক বস্তা বালু ফেলে তার ওপর তেরপাল দিয়ে ঢেকে রেখে কাজ বন্ধ করে চলে যায় তারা। এরপর থেকে প্রায় দেড় মাস ধরে সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে।এ প্রসঙ্গে সোনাগাজী চরচান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন খোকন বলেন, সেতুটি নির্মাণে অনিয়ম হয়েছে। তৎকালীন সময়ে নির্মাণাধীন সেতুর গার্ডার ভেঙে পড়ে। সেজন্য যানচলাচলের সময় সেতুটি কেঁপে ওঠে। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও ভারী বর্ষণে সেতুর পশ্চিম অংশে বড় গর্ত হয়ে সোনাগাজী ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের মধ্যে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় ভাঙনরোধে স্থানীয় এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বালুর ব্যাগ ফেলা হয়। পরে কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী সমাধান করায় বারবার সমস্যা দেখা দেয়।প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৫ মার্চ সাহেবেরঘাট সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফেনীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মনিরা হক স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে সেতু সংলগ্ন ছোট ফেনী নদী থেকে বালু উত্তোলন, সরবরাহ, পরিবহন ও মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন ৫ সদস্য বিশিষ্ট গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং সড়ক বিভাগ ফেনীর মতামতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।নিষেধাজ্ঞা মানছে না বালু কারবারিরাজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাহেবেরঘাট এলাকায় বালু উত্তোলন, মজুত ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও স্থানীয়রা বলছেন ভিন্ন কথা। স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেতু এলাকায় ১৫টির অধিক বালুমহাল রয়েছে। বালুমহালগুলোর বালু অন্য স্থান থেকে এখানে এনে স্তূপ করে বিক্রি করা হচ্ছে বলে দাবি করছে অবৈধ বালু ব্যবসায়ীরা। তবে স্থানীয়রা বলছেন, গভীর রাতে নির্জন এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাল্কহেড দিয়ে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, বালু পরিবহনে আশপাশের সড়কগুলোও ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি ছোট ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সাহেবেরঘাট ব্রিজও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাহেবেরঘাট এলাকায় বালু উত্তোলন, মজুত ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দিলেও বর্তমানে নিয়মিত বালুমহালের সব কার্যক্রম সচল রয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এসব বালুমহালের কারণে ইতোমধ্যে আমাদের এলাকার রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গেছে। সেতু এলাকায় অসংখ্য বাল্কহেড রয়েছে, যেগুলো দিয়ে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এমনিতেই সেতুটি নির্মাণে ত্রুটি রয়েছে এবং পাইলিং ও গভীরতা কম। বালু উত্তোলনের কারণে সেতুটি দিন দিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। জনগণের বৃহৎ স্বার্থের কথা বিবেচনা না করে জনবিরোধী বালুমহালকে দায়িত্বশীলরা প্রাধান্য দিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে মুছাপুর এবং কাজীহাট ব্রিজের মতো এটিও একদিন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে।