প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬
খেলোয়াড় গড়ে কারা, কৃতিত্ব পায় কারা? সাফল্যের আড়ালে পরিবার, ক্লাব ও ইনস্টিটিউটের গল্প
হাছান মাহমুদ রানা ||
একজন তরুণ ক্রিকেটার বড় দলে সুযোগ পেলে গর্বিত হয় পুরো জেলা। কিন্তু সেই সাফল্যের গল্পে তার পরিবার, ক্লাব ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বাদ পড়লে গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। খেলোয়াড় কোন জেলার হয়ে খেলেছে, তার পাশাপাশি সে কোথায় শিখেছে, কারা তাকে প্রস্তুত করেছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানের খেলাধুলার জন্য সময় ও সুযোগ করে দেওয়া এখনো একটি বড় সামাজিক পরীক্ষা। পড়াশোনা ও নিশ্চিত জীবিকার প্রত্যাশার মধ্যে “খেলে কী হবে?” প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অভিভাবকদেরও। সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, যাতায়াত ও পুষ্টির খরচের পাশাপাশি তাঁদের বহন করতে হয় অনিশ্চয়তা। মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সামাজিক বাধার বাড়তি চাপও থাকতে পারে। কোনো নির্বাচক প্রতিভা চেনার অনেক আগেই পরিবারকে সেই স্বপ্নের পাশে দাঁড়াতে হয়।ক্লাব সেই স্বপ্নকে বেড়ে ওঠার পরিবেশ দেয়। নিয়মিত অনুশীলন, সময়ানুবর্তিতা, দলের প্রতি দায়বদ্ধতা, সতীর্থের পাশে থাকা এবং ব্যর্থতার পর ফিরে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে ওঠে ক্লাবের সংস্কৃতিতে। নিজের ভুলের দায় নেওয়া, জয়-পরাজয় সামলানো এবং ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দলের প্রয়োজন বুঝতে শেখাও খেলোয়াড়ের প্রস্তুতির অংশ।তবে একটি সুস্থ ক্লাবের ভূমিকা ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। সেখানে একজন কিশোর বা কিশোরী ভালো বন্ধু, দায়িত্বশীল সিনিয়র এবং পথ দেখানোর মানুষ পেতে পারে। ভুল পথে পা বাড়ালে কেউ তাকে বোঝাবে, অনুশীলনে অনুপস্থিত থাকলে খোঁজ নেবে, বিপদে পাশে দাঁড়াবে—এই সম্পর্কগুলো তাকে আপনজনের মধ্যে থাকার অনুভূতি দেয়। শুধু “খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলো” বলার বদলে ক্লাব তাকে ভালো সঙ্গ ও সময় কাটানোর অর্থবহ জায়গা দিতে পারে। নিয়মিত খেলাধুলা, সুস্থ সম্পর্ক ও জবাবদিহির এই পরিবেশ অসৎ সঙ্গ, মাদক ও অপরাধের মতো ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করতে পারে।সবাই জাতীয় দলের ক্রিকেটার হবে না। কিন্তু ক্লাব থেকে শেখা শৃঙ্খলা, আত্মসংযম, নেতৃত্ব ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ভবিষ্যতের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনেও কাজে লাগে। একজন কিশোর বা কিশোরী দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠল, ভুল পথে পা বাড়ানোর আগেই কাউকে পথপ্রদর্শক হিসেবে পেল—এসব অর্জনের কোনো স্কোরকার্ড নেই। তাই ক্লাবের অবদান শুধু ট্রফি বা নির্বাচিত খেলোয়াড়ের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না।ইনস্টিটিউট বা একাডেমি এই প্রস্তুতিতে যোগ করে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ। কৌশল শেখানো, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং দিনের পর দিন ভুল সংশোধনের মাধ্যমে প্রতিভাকে দক্ষতায় রূপ দেওয়া হয়। ক্লাব ও ইনস্টিটিউটের কাজ অনেক ক্ষেত্রে মিলেমিশে যায়, কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদি শ্রমের গুরুত্ব তাতে কমে না।বিষয়টি একটি শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পরিবার তাকে আগলে রাখে, বিদ্যালয় শিক্ষা দেয়, প্রয়োজনে গৃহশিক্ষক দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করেন। এরপর যোগ্যতা অর্জন করে সে পরীক্ষায় অংশ নেয়। যে প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার নিবন্ধন ও অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করে, তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু “আমরা পরীক্ষায় বসতে দিয়েছি” বলেই শিক্ষার্থীর ভালো ফলের পুরো কৃতিত্ব দাবি করা যায় না। ন্যায্য প্রত্যাশা হলো, যোগ্য শিক্ষার্থী যেন নিয়ম অনুযায়ী মূল্যায়নের সুযোগ পায়।ক্রিকেটেও বয়সভিত্তিক ও বিসিবির যেসব প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ের বাছাই ও মনোনয়ন অপরিহার্য, সেখানে জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কাঠামোর হাতে খেলোয়াড়ের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ থাকে। এই অবস্থান তাদের দায়িত্ব বাড়ায়। উন্মুক্ত ট্রায়াল, স্বচ্ছ মানদণ্ড, নিরপেক্ষ বাছাই এবং নির্বাচিতদের অংশগ্রহণে সহায়তা করা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। সেই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হওয়া খেলোয়াড়ের জন্য ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়।জেলার মাধ্যমে এগোতে হয় বলেই একজন খেলোয়াড়ের পুরো প্রস্তুতি ও সাফল্যের কৃতিত্ব জেলার হয়ে যায় না। পরিবার, ক্লাব ও ইনস্টিটিউটের বছরের পর বছরের পরিচর্যার সঙ্গে বাছাই করে প্রতিযোগিতায় পাঠানোর ভূমিকার পার্থক্য আছে। জেলা পর্যায়েও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ বা বিশেষ উন্নয়নের কাজ হলে তার স্বীকৃতি অবশ্যই প্রাপ্য। তবে কৃতিত্ব নির্ধারিত হওয়া উচিত বাস্তব অবদানে, সুযোগ দেওয়ার কর্তৃত্বে নয়।সাফল্যের সংবাদে ক্লাব ও ইনস্টিটিউটের নাম উল্লেখ করলে কারও সম্মান কমে না। বরং কারা খেলোয়াড় ও দায়িত্বশীল মানুষ গড়ার কাজ করছে, তা দৃশ্যমান হয়। এতে প্রশিক্ষকেরা উৎসাহ পান, অভিভাবকেরা আস্থা পান এবং তৃণমূলের প্রতিষ্ঠানগুলো পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার সুযোগ পায়।সবকিছুর কেন্দ্রে থাকবে খেলোয়াড়ের নিজের শ্রম। জেলার হয়ে খেলা তার যাত্রাপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; তাকে গড়ে তোলার ইতিহাস আরও দীর্ঘ। সেই ইতিহাসে পরিবারের ত্যাগ, প্রশিক্ষকের ধৈর্য আর ক্লাবের পথপ্রদর্শক মানুষগুলোর সময়ও আছে। সাফল্যের আলোয় তাঁদের মুখগুলোও দেখা যাক।আল্লাহ আমাদের সন্তানদের ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দিন। তাদের গড়ে তোলায় যাঁরা শ্রম, সময় ও ভালোবাসা দিচ্ছেন, তাঁদের প্রচেষ্টা কবুল করুন। আমাদের সবাইকে অন্যের অবদান যথাযথভাবে স্বীকার করার উদারতা দিন। আমিন।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী