প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তোপে মুখে পড়েছেন ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহ। তার বিরুদ্ধে দপ্তরের অনাবাসিক ভবন মেরামতে অর্থ লোপাট, প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে অর্থ আত্মসাত, স্বাক্ষর জালিয়াতি, অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার-মারধরসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে দপ্তর পরিচালনায় কঠোর নিয়ম-নীতি অনুসরণের কারণে বিরাগভাজন হয়েছেন দাবি করলেও একাধিক অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি থেকে ফেনী উপপরিচালকের কার্যালয়ের অনাবাসিক ভবন মেরামতের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজটির দায়িত্ব দেওয়া হয় মেসার্স সাজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কাজটি নিজেই করেছেন উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহ। বরাদ্দের পুরো ৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে খরচ হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৮০ টাকা। সেই ভবনের জলছাদের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।এ প্রসঙ্গে মেসার্স সাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এবি ছিদ্দিকী ভূঁইয়া বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফেনীর রঙের কাজ আমার প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। উপপরিচালক কাজটি সমন্বয় করেছেন। দাপ্তরিকভাবে একটা কাজ দিতে হয়, সেজন্য আমাকে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ কিছু আছে কি না, আমি জানি না। আমি কেনাকাটা করে লোকবল দিয়েছি। তিনি সবকিছু করেছেন। তবে বিল-ভাউচার সরকারি নিয়ম মেনে হয়েছে। আমার মাধ্যমে বিল হয়েছে। তবে এ অভিযোগের ব্যাপারে উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহর কাছ থেকে সদুত্তর মেলেনি।একইভাবে মাশরুম প্রকল্পের মাঠ দিবস না করেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি মাসে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাস প্রকল্পের আওতায় ফেনী জেলায় মাঠ দিবস আয়োজনের জন্য ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ কর্মসূচিতে কমপক্ষে ২০০ কৃষক-কৃষাণির উপস্থিতি, পরিচালক ও সমন্বয়কারীর সম্মানি, অতিথিদের সম্মানি, আপ্যায়ন, মাঠ দিবস সহায়তাকারী ভাতা, সাজসজ্জা ও আনুষঙ্গিক খরচ থাকার কথা।অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেনী সদরের শর্শদী ইউনিয়নে মাশরুম চাষসংক্রান্ত কোনো মাঠ দিবস কিংবা কৃষকদের জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন না করেই পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।এ বিষয়ে উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহ বলেন, আমাদের অনেক কাজ বাকি আছে, টাকা জমা আছে। কর্মসূচি না করেই টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুন ক্লোজিং, সেজন্য টাকা তুলতে হয়েছে। আমাদের কিছু সময় অগ্রিম বিল তুলতে হয়। তবে আমি প্রোগ্রাম নিয়ে আসব।উপপরিচালকের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ফেনীর একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, এটি গত অর্থবছরের মাঠ দিবসের কর্মসূচি, যা জেলা অফিসের আয়োজন করার কথা ছিল। প্রদর্শনী আমরা বাস্তবায়ন করলেও মাঠ দিবস জেলা অফিস করেনি। ভুয়া বিল-ভাউচার করে উপপরিচালক টাকা উত্তোলন করেছেন। টাকা উত্তোলনের সময় অধীনস্থদের ডেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে এবং যাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া সম্ভব হয়নি, তাদের স্বাক্ষর জাল করে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।সদর উপজেলার একটি ইউনিয়ন ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ কর্মসূচিটি আগে করার কোনো নির্দেশনা পাইনি। আগে বাস্তবায়নও করা হয়নি। তবে গত দুই-একদিন আগে স্যার (উপপরিচালক) কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি।অন্যদিকে সরকারি অর্থ উত্তোলনে ভুয়া বিল-ভাউচারের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছে উপপরিচালকের বিরুদ্ধে।স্বাক্ষর জাল করে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক বলেন, জুন ক্লোজিং, সেজন্য টাকা তুলতে হয়েছে। তবে সাংবাদিক, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন ব্যক্তির স্বাক্ষর জাল করে কেন টাকা তোলা হয়েছে এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে একপর্যায়ে পরে দেখা করবেন বলে ফোনকল কেটে দেন তিনি।অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালকের জন্য আবাসিক কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও অতিথিদের জন্য নির্ধারিত ডরমেটরি বা প্রশিক্ষণ হলরুম-সংলগ্ন দুটি কক্ষ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর একটি কক্ষে উপপরিচালক নিজে এবং অপরটিতে তার ভাগিনা ইমরান হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। ইমরান হোসেন কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা। জানা গেছে, তিনি গত ৮ থেকে ৯ মাস ধরে উপপরিচালকের কার্যালয়ের অতিথিকক্ষে অবস্থান করছেন। সেখানে রান্নাবান্না ছাড়াও ব্যক্তিগত কার্যক্রমও পরিচালনা করেন।সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, অতিথিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে ভাড়া নেওয়ার নিয়ম থাকলেও উপপরিচালক কিংবা তার ভাগিনা কোনো ধরনের ভাড়া না দিয়েই সেখানে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে দপ্তরের একজন অফিস সহায়ক জানান, কৃষি অফিসে স্যার একজন ভাগিনাসহ থাকেন। তাদের রুম আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করি। ভাড়া না দিয়েই তারা দীর্ঘদিন ধরে থাকছেন।এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার উপপরিচালককে ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।ফল মেলা ও পার্টনার কংগ্রেসের অর্থ ব্যয় নিয়েও প্রশ্নজাতীয় ফল মেলা এবং ফেনী সদর উপজেলা পার্টনার প্রকল্পের কংগ্রেস পৃথক কর্মসূচি এবং ভিন্ন সময়ে আয়োজনের কথা থাকলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৮ জুন সদর উপজেলার পার্টনার কংগ্রেস কর্মসূচির সাথে জাতীয় ফল মেলা একই দিনে নামমাত্র ফলের পসরা সাজিয়ে বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। এছাড়াও জেলায় অনুষ্ঠিত জাতীয় ফল মেলার জন্য বরাদ্দের ২৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ কর্মসূচি একইদিনে বাস্তবায়নে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে চাপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহ বলেন, দুটি আলাদা কর্মসূচি হলেও একসঙ্গে করার কারণ আমাদের মূল কর্মসূচি ছিল পার্টনার কংগ্রেস। সকালে ফল মেলার উদ্বোধন এবং দুপুরে পার্টনার কংগ্রেসের উদ্বোধন করা হয়।আলাদা বরাদ্দের কর্মসূচি কেন একসঙ্গে করা হলো এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ১০ হাজার টাকা দিয়ে কীভাবে একটা প্রোগ্রাম করব? জেলা প্রশাসকের পরামর্শ নিয়েই কর্মসূচি দুটি একসঙ্গে করা হয়েছে। তিনি এ কমিটির সভাপতি ছিলেন।কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মাঠ দিবস, প্রদর্শনী ও পরিদর্শনে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে আতিক উল্ল্যাহর বিরুদ্ধে। একইরকম আচরণের অভিযোগ রয়েছে জেলা ও উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গেও।নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি অফিসের এক অফিস সহায়ক বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। আমরা যেহেতু কর্মচারী, আমাদের যোগ্যতা কম, ভুল হতে পারে। তবে তিনি ছোট ভুলকেও বড় করে দেখেন। পাশাপাশি বেতন বন্ধ করার হুমকি দেন। ভয়ে কিছু বলতে পারি না। নিয়মিত কাজের বাইরেও অনেক কাজ করান।ফেনী সদরের কৃষক নোমান বলেন, তিনি খাগড়া চাষের একটি প্রদর্শনী করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রদর্শনীর সব কার্যক্রম সম্পন্ন করলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহ পরিদর্শনে আসেননি। যেকোনো সময় পরিদর্শনে আসার জন্য তাকে বারবার অনুরোধ করা হলেও তিনি আসেননি। মৌসুমের শেষে এসে তিনি তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। প্রদর্শনীর সব উপকরণ দেখাতে চাইলেও তা না দেখে সনদ দেওয়া হবে না বলে চলে যান। নোমান অভিযোগ করে বলেন, কৃষকদের সঙ্গে উপপরিচালকের আচরণ ভালো নয়। তিনি সবসময় কৃষকদের সঙ্গে ধমকের সুরে কথা বলেন।মো. সাঈদ নামে অপর এক কৃষক বলেন, উপপরিচালক পরিদর্শনে কিংবা কোনো কৃষি অনুষ্ঠানে এলেই কৃষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। গালিগালাজ ও ধমকের মাধ্যমে কথা বলেন। এমনকি কৃষকদের সামনেই কৃষি কর্মকর্তাদের অপমান করেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদেরও তিনি মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেন না।কৃষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, মাঠ পর্যায়ে আমরা প্রোগ্রাম করতে গেলে সকলের সামনেই এমন আচরণ করেন। তিনি প্রদর্শনীর কৃষকদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেন।ওই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, উপপরিচালক অনেক সময় দুপুরের দিকে উপজেলা অফিসে যান এবং সেখানে তার সঙ্গে থাকা ড্রাইভারসহ অন্যদের জন্য দুপুরের খাবার ও বিভিন্ন ভাতার ব্যবস্থা করতে হয়। উপজেলায় আমাদের এত বরাদ্দ নেই। তার সঙ্গে ড্রাইভার থাকে, অন্যান্য মানুষও থাকে। সবাইকে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ভাতা দিতে হয়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, উপপরিচালক উপজেলা অফিসে গিয়ে নিজের গাড়ি রেখে অন্য কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শনে যান। দুপুরের খাবার, যাতায়াত, পরিদর্শন ভাতাসহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিয়মিত নেন তিনি।ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নিজের গাড়ির জ্বালানি খরচ না করে অন্য কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহার করেন উপপরিচালক। এমনকি নিজের গাড়ির তেল বিক্রি করে দেওয়ার কথাও শুনেছেন বলে জানান তিনি।এসব অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকল কেটে দেন।অনিয়মে সায় না দেওয়ায় বেতন বন্ধের অভিযোগবিভিন্ন অনিয়মে সায় না দেওয়ায় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনের বেতন বন্ধের জন্য হিসাব শাখায় আবেদন পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জুলাই মাসের ২৩ তারিখ জেলা একাউন্টস ও ফিন্যান্স অফিসার বরাবর জুলাই ২০২৬ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বেতন বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে আগস্ট মাসের ২৩ তারিখ বেতন ভাতা বন্ধের আদেশ প্রত্যাহার করেন তিনি।এ ব্যাপারে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহিউদ্দিন বলেন, আমার বেতন বন্ধ করার এখতিয়ার ওনার নেই। হিসাব অফিস ওই আবেদন আমলে নেয়নি এবং এখতিয়ারবহির্ভূত হওয়ায় তা বাতিল করে দিয়েছে।এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহ বলেন, সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বেতন বন্ধের নথি আপনার কাছে কিভাবে গেল? এসব আমাদের রুটিন কাজ। জেলা কর্মকর্তা হিসেবে আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে, সেজন্যই দিয়েছি। কাজের গতি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে বেতন বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছি।কর্মচারীকে থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগগত ৩০ আগস্ট কৃষি অফিসের মাসিক সভায় অফিস সহকারী কাম পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাহমুদুল হাসানকে থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহর বিরুদ্ধে। সভা শেষ করে একটা ব্যানার খুলে আরেকটা গুছিয়ে নিতে দেরি হওয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে আকস্মিক থাপ্পড় দেন তিনি। এই অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকল কেটে দেন।সেদিন ওই সভায় উপস্থিত আরেকজন কর্মচারী বলেন, একজন সরকারি কর্মচারীর গায়ে এভাবে হাত তোলা কখনোই যুক্তিসঙ্গত নয়। আমরা ভয়ে বলতে পারি না, তবে তিনি এমনটা করেন।উপজেলার কৃষি অফিসের কর্মরতদের যত অভিযোগফেনী সদরের ন্যায় জেলার অন্যান্য উপজেলায় কৃষক, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সার ডিলারদের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিক উল্যাহর অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে কয়েকটি উপজেলায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হয়েছে।ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুলগাজী উপজেলা পরিদর্শনকালে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ প্রদর্শনী পরিদর্শনের সময় নির্ধারিত জমির চেয়ে বেশি জমিতে প্রদর্শনী করা হয়নি এমন প্রশ্ন তুলে কৃষক ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপ পরিচালকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সাপ্তাহিক সভায় উপরিচালকের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান দরবারপুর ইউনিয়নের ধলিয়া ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনোজ কান্তি দেব নাথসহ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। এসময় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনা ঘটে।মনোজ কান্তি দেব নাথ বলেন, উপপরিচালক জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমাদের ভুলত্রুটি এবং সফলতা যাই থাকুক, সেটা দাপ্তরিকভাবে জানালে ভালো হতো। কিন্তু তিনি কৃষকদের সামনে আমাদের লাঞ্ছিত করেন। সাপ্তাহিক সভায় আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছি। বিগত ১০ বছর মাঠপর্যায়ে কাজ করছি, এভাবে আচরণ করলে আমাদের সম্মান থাকে না। তিনি আমাদের অভিভাবক, আমরা তার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ আশা করি না।পরশুরাম উপজেলা পরিদর্শনে গিয়ে নাস্তা দিতে দেরি হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে রেগে গিয়ে খারাপ ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।ছাগলনাইয়া উপজেলার পশ্চিম শুভপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রনি মজুমদারকে মাঠ পরিদর্শনের সময় কৃষকের সামনে গালমন্দ করে অপমান করার অভিযোগ উঠেছে উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠে ও সাপ্তাহিক সভায় একাধিকবার বাকবিতণ্ডায় জড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের সামনে আমাদের গালমন্দ করে অপদস্থ করেন। তার আচরণে কৃষকরা অতিষ্ঠ। তিনি আসছেন শুনলে কৃষকরা বলে ওঠেনÑ‘আপনাদের পাগলা অফিসার আসছে।’ এতে আমাদের এবং কৃষি বিভাগের সম্মান নষ্ট হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের এক সহকর্মীর শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর জানাজায় অংশ নেওয়া নিয়েও তাকে শাসিয়েছেন।ছাগলনাইয়ার বিসিআইসি সার ডিলার মো. নুর নবী উপপরিচালকের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তিনি পরিদর্শনে আসবেন, এতে সমস্যা নেই। কিন্তু এসেই তুই-তোকারি শুরু করেন। আমি ১৯৮৫ সাল থেকে সারের ডিলারের সঙ্গে জড়িত। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও ক্রেতাদের সামনে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলায় সম্মান হারাচ্ছি।অন্যদিকে সোনাগাজীর বগাদানা ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমানের পার্টনার প্রকল্পের বোরো ধান প্রদর্শনীর ফিল্ড টেকনোলজি ওরিয়েন্টেশনে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা পর উপস্থিত হয়ে কৃষকের সঙ্গে তর্কে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেদিন নির্ধারিত সময় দুপুর ১২টায় কর্মসূচি থাকলেও তিনি প্রায় দেড়টায় উপস্থিত হন। এ সময় প্রায় ২৫ জন কৃষক তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। দুজন কৃষক কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে প্রদর্শনী প্লটের আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। অন্যদিকে কয়েকজন কৃষক নামাজ পড়তে মসজিদে গেলে তিনি ক্ষুব্ধ হন।তারা জানান, উপপরিচালক ওই দুই কৃষককে সবার সামনে হেয় করে শ্রমিকদের ‘কামলা’ বলে সম্বোধন করেন এবং তাদের কর্মসূচিতে না আসা ও ফটোসেশনে অংশ না নেওয়ার কথা বলেন।ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ডিডির এসব আচরণ আমার পছন্দ হয়নি। তাই আমি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করি।অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা-মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অতিরিক্ত পরিচালক ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিক উল্ল্যাহর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে। দৈনিক ফেনীকে তিনি বলেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা থাকলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফেনী সফরের পর বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।বরাদ্দের টাকা ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে আসলেও উত্তোলন করে কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, নিয়ম হলো জুন মাসে যখন বরাদ্দ আসে, তখন তড়িঘড়ি করে টাকা উত্তোলন করে আগস্টের সুবিধাজনক সময়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। জুন মাসের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে। অন্য কোনো সময়ের বরাদ্দের ক্ষেত্রে এমন করার সুযোগ নেই।কৃষকদের পরিবর্তে অন্যদের দিয়ে স্বাক্ষর করানো বা স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি অবশ্যই অন্যায়।সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বেতন বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, এটি উপপরিচালকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।‘পার্টনার কংগ্রেস’ কর্মসূচির দিনে ফল মেলা আয়োজনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার একটি কর্মসূচি হয়। ফল মেলার উদ্বোধনী কর্মসূচিও হয়। অংশগ্রহণ দেখানোর জন্য হয়তো কৃষকদের কাজে লাগানো হতে পারে।একজন সরকারি কর্মকর্তা কৃষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং অধস্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে পারেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি অন্যায়, কৃষক সম্মানিত ব্যক্তি। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের গায়ে হাত দেওয়ারও সুযোগ নেই।