প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
মামলার এখতিয়ার নেই পুলিশের, ৩ সরকারি কর্মচারীর জামিন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ফুলগাজী ||
সরকারি চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের ৫১ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তিন সরকারি কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় পরিষদের স্টেনোটাইপিস্ট-কাম-কম্পিউটার অপারেটর আবদুল হালিম চৌধুরী বাদী হয়ে ফুলগাজী থানায় তাদের তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। গতকাল রোববার (১২ জুলাই) ফুলগাজী আমলি আদালতের বিচারক মো. শহীদুল ইসলাম তিন আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন।মামলাটি পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত না হওয়ায় গ্রেপ্তারের চারদিন পর আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন চেক জালিয়াতিতে জড়িত পরিষদের তিন কর্মচারী। মামলার বাদী জানান, গতকাল রোববার (১২ জুলাই) মামলাটির শুনানির ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তাকে আদালতে যেতে বলা হয়নি এবং বাদীপক্ষের আইনজীবী কেউ ছিলেন কিনা তাও তিনি জানেন না।পুলিশ সূত্র বলছে, মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তদন্তের জন্য দুদকে প্রেরণ করা হয়েছে। দুদক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এখনো এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ তাদের কাছে পৌঁছায়নি। তবে বিষয়টি তারা অবহিত হয়েছেন।সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা গেলেও মামলা করার এখতিয়ার রয়েছে কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের ২৬টি সরকারি চেক জালিয়াতির ঘটনায় থানায় তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে এফআইআর করার কারণে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনগত ভুলের বিষয়টি স্বীকার করেন ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নিশাত তাবাসসুম। তিনি জানান, উপজেলা পরিষদের এজাহার অনুযায়ী থানায় মামলা নেওয়া হয়েছিল। পরে আইনগতভাবে ভুল হওয়ার কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলাটি শেষ করে দুদকে পাঠানো হয়েছে। এ মামলা করার এখতিয়ার পুলিশের নেই। যেভাবে আদেশ হয়েছে, সেভাবেই কাজ করা হয়েছে।ওই তিন কর্মচারীর জামিন না অব্যাহতি পেয়েছেন—এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটি আদালতের সিদ্ধান্ত। এখানে পুলিশের কোনো এখতিয়ার নেই। কারণ মামলাটি এখন দুদকে তদন্তাধীন রয়েছে।তবে এ ঘটনায় দুদকে এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ এসে পৌঁছায়নি বলে দুদক সমন্বিত নোয়াখালী কার্যালয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে। ৫১ লাখ টাকার চেক জালিয়াতি প্রসঙ্গে দুদকের উপসহকারী পরিচালক জাহেদ আলম দৈনিক ফেনীকে জানান, যে অভিযোগের কথা জানতে পেরেছি তা দুদক সংশ্লিষ্ট আইনে বিচারযোগ্য। এ ধরনের তদন্তকাজ দুদক করে থাকে।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান জানান, এটি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ। তাই এ ধরনের মামলার তদন্ত ও বিচারিক এখতিয়ার কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। আদালতও এ বিষয়ে অবজারভেশন দিয়ে মামলার ডকেট দুদকে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে দুদক আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।তিনি বলেন, একই বিষয়ে থানার মামলার তদন্ত ও দুদকের তদন্ত সমান্তরালভাবে চলার সুযোগ নেই। দুদক মামলাটি গ্রহণ করার পর তাদের নিজস্ব তদন্তের মাধ্যমে পুরো ঘটনার নেপথ্যে কারা জড়িত, কারা উপকৃত হয়েছে এবং সামনে-পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, সবকিছু খতিয়ে দেখবে। শুরুতেই কেন থানায় মামলা করা হয়েছিল—এ প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, এটি উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিষয়।বর্তমানে ফুলগাজীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতনু বড়ুয়া বলেন, মামলার বিচারিক বিষয় আদালতের এখতিয়ার। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে।এর আগে গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন ও রাজস্ব খাতের ২৬টি চেকের টাকার অঙ্ক ও বানান পরিবর্তন করে প্রায় ৫১ লাখ টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পরিষদের সাবেক সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পার্থ সারথী পাল, বর্তমান অফিস সহায়ক মো. ফিরোজ এবং নুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পার্থ সারথী পাল বর্তমানে ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদে কর্মরত।অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩ মার্চ পর্যন্ত আট মাসে ২৬টি চেকের প্রতিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বাক্ষরের পর মূল অঙ্কের সঙ্গে কৌশলে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা এবং কথার অংশেও একই পরিমাণ অর্থ যুক্ত করে ধারাবাহিকভাবে এই জালিয়াতি করা হয়েছে। এমন ঘটনায় প্রশাসনিক তদারকিতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে বিদায়ী ইউএনও ফাহরিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে।মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২৬টি চেকে প্রকৃত অনুমোদিত অর্থ ছিল মাত্র ৭ লাখ ৪৫৫ টাকা। কিন্তু প্রতিটি চেকে দুই লাখ টাকা করে বাড়তি যোগ করে ব্যাংক থেকে মোট ৫১ লাখ ৪৫৫ টাকা উত্তোলন করা হয়। প্রথম জালিয়াতির ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই অফিস আপ্যায়ন খাতের ৩ হাজার টাকার একটি চেকে। সেটি পরিবর্তন করে ২ লাখ ৩ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩ মার্চ গাড়ির জ্বালানি বিলের ১৬ হাজার ৭২২ টাকার চেকেও একই কৌশলে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা যোগ করা হয়।জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী ইউএনও ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ফাহরিয়া ইসলাম দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতিকালে চেকবইয়ের কাউন্টারফয়েল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রেজিস্টার ও ভাউচার মিলিয়ে হিসাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে অসঙ্গতি শনাক্ত করেন। পরে বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে চেক জালিয়াতির বিষয়টি উদঘাটিত হয়।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী