প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
নদীতে উচ্ছ্বাস, মানুষের দীর্ঘশ্বাস
মোর্শেদ ||
বর্ষা যেন বাংলার চিরন্তন এক কবিতা। কালো মেঘের ভেলায় ভেসে আসে তার আগমনবার্তা, তারপর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দে ধুয়ে যায় ধুলাবালিতে ঢাকা জনপদ। কদমের সুবাস, সবুজ ধানের মাঠ, নদীর বুকে উচ্ছ্বসিত ঢেউ আর দূর আকাশে মেঘের আনাগোনা—সব মিলিয়ে প্রকৃতি ফিরে পায় তার চিরচেনা রূপ। কিন্তু এই রূপের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মানুষের উৎকণ্ঠা, কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর দিনমজুরের অনিশ্চয়তা।
মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৫ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টি ঝরছে ফুলগাজী ও পরশুরামজুড়ে। শনিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। প্রতিবেশী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিলোনিয়াসহ উজান এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টির কারণে মুহুরী, সিলোনিয়া ও কহুয়া নদীর পানির প্রবাহ বেড়ে আবার কমছে। নদীর পানি ওঠানামা করলেও তীরবর্তী মানুষের মনে এখনও বন্যার আশঙ্কা কাটেনি।
মুহুরী নদীর বুক ভরে ছুটে চলা স্রোত, পানিতে টইটম্বুর বিস্তীর্ণ মাঠ আর বৃষ্টিভেজা সবুজ প্রকৃতি যেন জানিয়ে দেয়, বর্ষা এসেছে তার নিজস্ব মহিমায়। নদী ফিরে পেয়েছে হারানো যৌবন। কিন্তু প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য জনপদের সব মানুষের কাছে সমান আনন্দ বয়ে আনে না।
জীবন ও জীবিকার তাগিদে ছাতা হাতে কিংবা ভেজা কাপড়েই ঘর থেকে বের হচ্ছেন মানুষ। ফুলগাজী সদর, মুন্সীরহাট, জিএমহাট ও আমজাদহাট ইউনিয়নের অনেক কাঁচা সড়ক কাদাময় হয়ে পড়েছে। স্কুলগামী শিশুদের কারও হাতে জুতা, কারও পায়ে কাদা মেখেই পথচলা।
কর্মজীবী মানুষ, রোগী ও দিনমজুরদের দুর্ভোগ যেন প্রতিদিনই বাড়ছে। অনেক বসতবাড়ির আঙিনায় পানি জমে থাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ এখন কৃষকের মাঠে। সবুজে মোড়া জমিতে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি আমনের বীজতলা ও সবজি চাষের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আমন ধানের বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ৩৪৬ দশমিক ৫০ হেক্টর। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৮৫ হেক্টরে বীজতলা প্রস্তুত হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকদের আপাতত নতুন করে বীজতলায় বীজ বপন না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উঁচু স্থানে বীজতলা তৈরি এবং যেসব বীজতলা ইতোমধ্যে করা হয়েছে, সেখান থেকে ড্রেন কেটে অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।
গ্রীষ্মকালীন সবজির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ হেক্টর। এর মধ্যে ১৪৯ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে এবং ১২০ হেক্টরের ফসল ইতোমধ্যে কৃষকের ঘরে উঠেছে। তবে টানা অতিবৃষ্টিতে প্রায় ১৫ হেক্টর সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলে জমি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মুন্সীরহাট ইউনিয়নের কৃষক রহিম বলেন, “টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে শসা, করলা ও কাঁচা মরিচের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আরও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. খোরশেদ আলম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। বীজতলা উঁচু স্থানে করতে হবে এবং কোথাও পানি জমে থাকলে দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হবে। বৃষ্টি থেমে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক প্রয়োগেরও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।”
বর্ষা বাংলার প্রকৃতিকে যেমন নতুন প্রাণ দেয়, তেমনি মানুষের জীবনেও নিয়ে আসে কঠিন পরীক্ষা। নদীর উচ্ছ্বাস, সবুজের সমারোহ আর বৃষ্টির স্নিগ্ধতা একদিকে প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে, অন্যদিকে কৃষকের কপালে ফেলে চিন্তার ভাঁজ। তাই ফুলগাজীর বর্ষা শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়; এটি সংগ্রামেরও গল্প। এখানে নদীর উচ্ছ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস, আর বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী