প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬
এক বছরে ২৬টি চেক জাল করে ৫১ লাখ টাকা গায়েব
||
দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের ২৬টি মূল অঙ্কের চেককে জাল বানিয়ে রাজস্ব তহবিলের ৫১ লাখ টাকা গায়েব করা হয়েছে। ফুুলগাজী উপজেলা পরিষদের কিছু কর্মচারীর সুনিপুণ যোগসাজশে এমন জালিয়াতির কাণ্ড ঘটলেও এক বছর ধরে প্রশাসন, হিসাবরক্ষণ দপ্তর, নিয়মিত আর্থিক তদারকি কিংবা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেউই হিসেবে এই গরমিল টের পাননি।গত সোমবার (৬ জুলাই) চেক জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর পরিষদের তিন কর্মচারীকে নিজ কার্যালয়ে ডেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন ফুলগাজীর বিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদ প্রশাসক ফাহরিয়া ইসলাম। পরে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তাদের গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি প্রকাশ পায়।এ ঘটনায় জড়িত তিন কর্মচারী হলেন উপজেলা পরিষদের সাবেক সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পার্থ সারথী পাল, বর্তমান অফিস সহায়ক মো. ফিরোজ এবং নূর ইসলাম। ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের স্টেনোটাইপিস্ট-কাম-কম্পিউটার অপারেটর আবদুল হালিম চৌধুরী সুজন বাদী হয়ে তাদের তিনজনকে আসামি করে ফুলগাজী থানায় মামলা করেছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।গ্রেপ্তার পার্থ সারথী পাল বর্তমানে ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদে কর্মরত রয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামে। এছাড়া অফিস সহায়ক নূর ইসলামের বাড়ি ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের উত্তর বরইয়া গ্রামে এবং মো. ফিরোজের বাড়ি পরশুরাম উপজেলার গুথুমা গ্রামে।মামলার এজাহার ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে উপজেলা পরিষদের রাজস্ব খাতের ২৬টি চেকে ইউএনও’র স্বাক্ষর নেওয়ার পর মূল টাকার অঙ্কের আগে অতিরিক্ত সংখ্যা এবং টাকার বানানে অতিরিক্ত শব্দ যুক্ত করে অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে এ জালিয়াতি করা হয়েছে। পরে সেই চেকের মাধ্যমে সরকারি তহবিল থেকে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের পর আত্মসাত করা হয়েছে। কিন্তু চেকবইয়ের কাউন্টারফয়েলে মূল অনুমোদিত অঙ্কই উল্লেখ থাকায় দীর্ঘদিন পর জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে।এজাহার অনুযায়ী, ২৬টি চেকে প্রকৃত অনুমোদিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৪৫৫ টাকা। অথচ সেইসব চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৫৫ টাকা। হিসাবে অতিরিক্ত ৫১ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব তহবিল থেকে আত্মসাত করা হয়েছে।তবে দীর্ঘদিন ধরে এ জালিয়াতি করে আসলেও তা নজরে পড়েনি সংশ্লিষ্ট কোন কর্তৃপক্ষের। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে এনে আত্মসাৎকৃত অর্থের প্রকৃত গন্তব্য এবং অন্য কেউ সম্পৃক্ত রয়েছে কিনা তা উদঘাটনের চেষ্টা করা হবে। গতকাল দুপুরে ওই মামলায় তাদের তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মিজানুর রহমান। তিনি জানান, উপজেলা পরিষদের এজাহারের ভিত্তিতে মামলা করা হয়েছে। তদন্তের জন্য হিসাব-সংক্রান্ত নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট চেক ও ব্যাংকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মনিরা হক জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অফিসের একজন কম্পিউটার অপারেটর ও দুইজন অফিস সহায়ক রাজস্ব তহবিলের বিভিন্ন খাতের চেকে অতিরিক্ত অঙ্ক বসিয়ে প্রায় ৫১ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।এ ব্যাপারে বিদায়ী ইউএনও ফাহরিয়া ইসলামের সাথে সরাসরি দেখা করলেও তিনি বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদককে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলতে বলেন তিনি।ফুলগাজী উপজেলার জিএমহাট ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, সরকারি অফিসে যারা জালিয়াতি করে, তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। এসব অনিয়মের কারণে জনগণই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়।
যেভাবে করা হত চেক জালিয়াতিদীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে গ্রেপ্তার ওই তিন কর্মচারী পরস্পরের যোগসাজশে এই জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাত করে এসেছেন। চেকগুলোতে লিখে পরিবর্তন করতেন পার্থ সারথী পাল। অপর দুই কর্মচারী বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করে আনতেন। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে চেকের ফাঁকা জায়গা রেখে পরে অতিরিক্ত সংখ্যা ও বানান বসিয়ে এ জালিয়াতি করা হত। প্রাথমিক তদন্তের পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফুলগাজী থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট অঙ্কের সরকারি চেক প্রস্তুত করে ইউএনওর স্বাক্ষর নেওয়ার পর অত্যন্ত কৌশলে চেকে ফাঁকা রাখা জায়গায় অতিরিক্ত সংখ্যা ও বানান যুক্ত করা হতো। এরপর সেই পরিবর্তিত চেক দিয়েই ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করা হত। চলতি বছরের ১ মার্চ সর্বশেষ একই ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। সেই মাসেই পার্থ সারথী পাল ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদে বদলি হন। তার বদলির পর বন্ধ হয়ে যায় চেক জালিয়াতির এ প্রতারণা। এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে জানান, মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। শুনানি শেষে তাদের রিমান্ড মঞ্জুর হলে অর্থের প্রকৃত গন্তব্য, অর্থ ভাগাভাগির ধরন এবং অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না- এসব বিষয়ে আরও তথ্য মিলতে পারে।
তবুও অনিয়ম হয়নি বলছেন ব্যাংক ব্যবস্থাপকদীর্ঘদিন ধরে ২৬টি চেক জালিয়াতি করে অর্থ উত্তোলন করে গেলেও চেকগুলোতে গরমিল ধরতে পারেনি ফুলগাজীর সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে এমন চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির পরও চেকের অর্থ প্রদানে কোন অনিয়ম হয়নি বলছেন সোনালী ব্যাংকের ফুলগাজী শাখার ব্যবস্থাপক গোপাল চন্দ্র মজুমদার। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দৈনিক ফেনীকে তিনি বলেন, ব্যাংকে উপস্থাপিত প্রতিটি চেকে স্বাক্ষর, টাকার অঙ্ক, বানান ও তারিখ ঠিক ছিল। দৃশ্যমান কোনো কাটাছেঁড়া বা ঘষামাজার আলামত ছিল না। ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম মেনেই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। কাউন্টারফয়েল ব্যাংকে আসে না, মূল চেক যাচাই করেই অর্থ পরিশোধ করা হয়। ব্যাংকের অর্থ প্রদানে কোন অনিয়ম হয়নি।তিনি আরও জানান, মার্চ মাসের ১ তারিখের পরে এ ধরনের কোন চেক ব্যাংকে আসেনি। আমি এপ্রিলে ফুলগাজীতে যোগদান করেছি।
আত্মসাতের অর্থ গেল কোথায়?চেক জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলিত অতিরিক্ত অর্থ কারা নিয়েছে, নগদে ভাগ হয়েছে নাকি অন্য কোনো হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে-এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকের লেনদেনের তথ্য, উত্তোলনের রেকর্ড এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত গন্তব্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হবে।একই কৌশলে একের পর এক করে ২৬টি চেকে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের পরও মাসিক ব্যাংক রিকনসিলিয়েশন, উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিংবা অডিটে বিষয়টি ধরা না পড়ায় সরকারি আর্থিক তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নফুলগাজী উপজেলা পরিষদে প্রায় এক বছর ধরে ২৬টি চেকে অতিরিক্ত ৫১ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ সামনে আসার পর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেকের অঙ্ক ও টাকার বানান পরিবর্তন করা হতো। তবে চেকবইয়ের কাউন্টারফয়েলে মূল অঙ্ক ঠিক থাকলেও বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরা পড়েনি।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি অর্থ লেনদেনে কেবল চেকে স্বাক্ষর করাই শেষ দায়িত্ব নয়; নিয়মিত হিসাব পর্যালোচনা, ব্যাংক রিকনসিলিয়েশন এবং আর্থিক তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও এই ঘটনায় সদ্য বিদায়ী ইউএনও ফাহরিয়া ইসলামের দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে হিসাব পুননিরীক্ষণের সময়ই এই জালিয়াতি ধরা পড়ে হয় এবং তাঁর উদ্যোগেই বিষয়টি মামলা পর্যন্ত গড়ায়।তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জালিয়াতির পুরো প্রক্রিয়া, কার কী দায়িত্ব ছিল এবং কোনো পর্যায়ে প্রশাসনিক অবহেলা ছিল কি না এসব বিষয় তদন্তের অংশ। তদন্ত শেষে দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী