প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
প্রযুক্তির শক্তি, মানুষের দায়িত্ব
রাশেদুল হাসান ||
একসময় মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি, টেলিফোন কিংবা মুখোমুখি আলাপ। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সেই বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে। এখন একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়। শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগ নয়, শিক্ষা, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, সাংবাদিকতা, বিনোদন, সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় তথ্য আদান-প্রদানেও সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ পরিবর্তনকে স্বীকৃতি জানাতে প্রতি বছর ৩০ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবস।২০১০ সালে প্রযুক্তিভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম `ম্যাশাবল' দিবসটির সূচনা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বৈশ্বিক সংযোগ, জ্ঞান বিনিময় এবং সামাজিক পরিবর্তনেরও শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং আজ এটি ডিজিটাল যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উপলক্ষ।সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের যোগাযোগের ধরন আমূল বদলে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি বার্তা, ছবি বা ভিডিও লক্ষ-কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। আগে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ছিল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল; এখন তা সহজ, দ্রুত এবং প্রায় বিনামূল্যে সম্ভব। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক বৈঠক, অনলাইন শিক্ষা কিংবা দূরবর্তী চিকিৎসা পরামর্শ সব ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু আড্ডার জায়গা নয় । এটি জ্ঞান অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। বিভিন্ন শিক্ষামূলক পেজ, ভিডিও, ওয়েবিনার, অনলাইন কোর্স এবং বিশেষজ্ঞদের আলোচনা সাধারণ মানুষের জন্য নতুন শেখার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গবেষকরা ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত থেকে শিক্ষা ও গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে সোশ্যাল মিডিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এখন অল্প খরচে নিজেদের পণ্য ও সেবা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং ই-কমার্স খাতের দ্রুত বিকাশের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।বাংলাদেশেও অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিও শক্তিশালী হচ্ছে।প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রক্তদানের আহ্বান, স্বাস্থ্যসচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষা প্রসার কিংবা মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা প্রশংসনীয়। কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং সহায়তা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর। বিশ্বের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাধারণ মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সমস্যার সমাধানে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ায় গ্রাম থেকে শহর সবখানেই সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বেড়েছে। সরকারি তথ্য প্রচার, অনলাইন শিক্ষা, কৃষি পরামর্শ, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ই-কমার্সের বিস্তারে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে, যা জাতীয় উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।যেখানে সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে ঝুঁকিও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, গুজব, সাইবার বুলিং, পরিচয় চুরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। অযাচাইকৃত তথ্য শেয়ার করার ফলে সামাজিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। আবার অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং পারিবারিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার উদ্বেগের কারণ।ডিজিটাল যুগে প্রত্যেক ব্যবহারকারীই একজন ডিজিটাল নাগরিক। তাই শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই হবে না, এর নৈতিক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। সত্য তথ্য প্রচার, ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা, কপিরাইটের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চাই একটি সুস্থ ডিজিটাল সমাজ গঠনের ভিত্তি।সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার সবার সম্মিলিত উদ্যোগে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস ও অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কালের কণ্ঠ
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী