অবশেষে ফেনীর উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সোনাগাজীতে ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া মুছাপুর রেগুলেটর পুর্ননির্মাণ এবং সোনাগাজীতে সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সচিবালয়ে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্প দুইটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সভায় মোট ১৩টি প্রকল্প অনুমোদনের মধ্যে ফেনী ও নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ ও জ্বালানি অবকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এই দুটি প্রকল্প স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। একনেক সভায় ‘ছোট ফেনী ও বামনী নদী অববাহিকার সমন্বিত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণসহ-১ম পর্যায়)’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ছোট ফেনী নদীর মোহনায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া মুছাপুর রেগুলেটর ও ক্লোজার পুনর্নির্মাণসহ নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।
মুছাপুর রেগুলেটর ধ্বংস হওয়ার পর থেকে সোনাগাজী ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় জোয়ারের পানি, লবণাক্ততা, তীব্র নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার নিরসনে স্থায়ী সমাধানের নতুন রেগুলেটর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সোনাগাজীর চরাঞ্চলে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নতুন জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পথও তৈরি হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ছোট ফেনী নদীর মোহনায় অবস্থিত মুছাপুর রেগুলেটরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে সাগর ও নদীর জোয়ারের পানি অবাধে অভ্যন্তরীণ এলাকায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। এতে সোনাগাজী উপজেলার নদী তীরবর্তী এবং নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি ও মৎস্যঘের লবণাক্ত পানির ক্ষতির মুখে পড়ে। একই সঙ্গে নদীভাঙন বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও কৃষি অর্থনীতি চাপে পড়ে।
নতুন প্রকল্পের আওতায় আগের অবকাঠামোর তুলনায় আধুনিক ও শক্তিশালী রেগুলেটর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেগুলেটর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নদী অববাহিকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও নদী ব্যবস্থাপনা উন্নত করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সোনাগাজী এবং মুছাপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার কৃষি ও মৎস্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, একনেকে অনুমোদন পেয়েছে ‘ফেনী জেলার সোনাগাজীতে সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ’ প্রকল্পটি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (ইজিসিবি) বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটির জন্য ২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছ।
তবে সোনাগাজীতে ১০৯ দশমিক ৭৭ মেগাওয়াট পিক (৮২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট এসি) ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পৃথক আরও একটি প্রকল্প রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপির বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় প্রকল্পটির মেয়াদ জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত এবং প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৮৮৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সোনাগাজীর চরাঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের পরিসর আরও বাড়বে। পরিকল্পিত সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে চরাঞ্চলের অনুন্নত ও অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহারযোগ্য জমিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে ওই এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মুছাপুর রেগুলেটর পুর্ননির্মাণের প্রকল্পটি সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জের মানুষের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। রেগুলেটরটি ধ্বংস হওয়ার পর লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, মৎস্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছিল।
এ প্রসঙ্গে নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস.এম. রেফাত জামিল বলেন, দীর্ঘদিনের গণমানুষের দাবি একনেকে পাশ হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি দুই জেলার মানুষের জন্য অত্যন্ত ভালো খরব। কাজগুলোর কীভাবে বাস্তবায়ন হবে বিস্তারিত পরে জানা যাবে।