ফেনী    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

মুহুরী-কহুয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধানে যত চ্যালেঞ্জ



বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধানে যত চ্যালেঞ্জ
ফাইল ছবি

ফেনীর উত্তরাঞ্চলে মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানে একনেকে অনুমোদিত ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ শিগগির শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে প্রকল্প শুরুর আগেই দৈনিক ফেনীর অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে নানা চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে এসেছে।

মুহুরী-কহুয়া নদী তীরবর্তী বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, নদীর প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকায় কোনো বাঁধ নেই। আবার বাঁধের ভেতরে রয়েছে সহস্রাধিক মানুষের বসতি, ধর্মীয় উপাসনালয়। কোথাও নদীর গতিপথ বদলে জেগেছে চর, কোথাও পুরোনো বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। পরশুরামের শালধর বাজার থেকে পরশুরাম হয়ে ছাগলনাইয়ার রেজু মিয়া পর্যন্ত সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে ফুলগাজীর জগতপুর থেকে রেজু মিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার অংশে বাঁধের অস্তিত্ব নেই বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ফলে নতুন প্রকল্পে শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, দীর্ঘদিনের বসতি, কৃষিজমি, ধর্মীয় স্থাপনা ও নদীর পরিবর্তিত গতিপথ বিবেচনায় রাখার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।

এ ব্যাপারে পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী ফাহাদ্দিস হোসেন বলেন, নদী সৃষ্টির পর থেকেই প্রায় ১৪ কিলোমিটার অংশে বাঁধ নেই।

ফুলগাজীর জগতপুর ব্রিজের কাছে নদী তীরবর্তী এলাকায় বাঁধ না থাকলেও ৫০-৬০টি পরিবার বসবাস করছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল ওয়াহাব বলেন, পানি বাড়লে এ এলাকার মানুষই আগে আতঙ্কে পড়ে। নতুন প্রকল্পে বাঁধহীন অংশের স্থায়ী সমাধান চান তাঁরা।

পুরোনো বাঁধের ভেতর ও নদীসংলগ্ন এলাকাতেও দীর্ঘদিন ধরে বসতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, এসব এলাকায় সহস্রাধিক মানুষ বসবাস করছে। দক্ষিণ বরইয়ায় একটি মসজিদ এবং দক্ষিণ শ্রীচন্দ্রপুরে একটি কালীমন্দির রয়েছে। নতুন বাঁধের নকশা ও বাস্তবায়নের সময় এসব স্থাপনা এবং বসতবাড়ির কী হবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

বরইয়ার হালিম বলেন, মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করছে। নতুন বাঁধ হলে বসতবাড়ি ও পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

নদীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও মূল স্রোত সরে গিয়ে চর জেগেছে, কোথাও স্রোত সরাসরি বাঁধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নদীর তীরে কৃষিজমিতেও চাষাবাদ চলছে। স্থানীয় কৃষক সাইফুল বলেন, চর জাগলে আমরা সেখানে চাষবাস করে থাকি। বাঁধ নির্মাণের সময় কৃষকের জমির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

মুহুরী-কহুয়া বাঁধ ভাঙার ইতিহাসও দীর্ঘ। পাউবোর বিভিন্ন সময়ের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত আট বছরে বাঁধটি অন্তত ৮৮ বার ভেঙেছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মুহুরী বাঁধের অন্তত ৮৬টি স্থানে ভাঙনের তথ্য রয়েছে। আর ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ১২২ কিলোমিটার বাঁধের অন্তত ১৯৫টি স্থানে ভাঙনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব ভাঙন সংস্কারে বিভিন্ন সময়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে নদীর বাঁধ সংস্কারে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায়ও বাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ মেরামত হলেও কয়েক বছর পর আবার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

এ ব্যাপারে পাউবো ফেনীর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শিহাব আহমেদ জানান, অনুমোদিত প্রকল্পে ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাশয় পুনঃখনন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ বা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মুহুরী প্রকল্পের ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার কাজ এখনো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যায়নি। তবে এই অর্থের প্রথম পর্যায়ের পরিকল্পনায় নদীর বাঁধ নির্মাণ, বাঁধের প্রতিরক্ষা ও নদী খননসহ বিভিন্ন কাজ রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি ছয় থেকে সাতটি সেকশনে ভাগ করে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নদীর বাঁধের ভেতরে সহস্রাধিক মানুষের বসতি ও ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে- এ বিষয়ে কোনো কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে চাইলে প্রকৌশলী শিহাব আহমেদ বলেন, বাঁধের ভেতরের এসব এলাকাকে ‘ফ্লাড প্লেইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বন্যার সময় কারও নিজস্ব জমিতে পানি উঠলে সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের পক্ষ থেকে কিছু করার থাকে না।

নদীর গতিপথ খননের সময় বাঁধের ভেতরের এসব বসতি ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি জেলা প্রশাসন বলতে পারবে। জগতপুর থেকে রেজু মিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকায় ফিজিবিলিটি স্টাডিতে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেভাবেই প্রকল্প পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ওই ১৪ কিলোমিটার এলাকায় প্রয়োজন নেই বলেই সেখানে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়নি। প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসন ৬৭ কিলোমিটার, নদী খনন ৮৪ কিলোমিটার এবং নদীর তীর প্রতিরক্ষা ১১ কিলোমিটার কাজের পরিকল্পনা রয়েছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন কমানো এবং কৃষিজমি ও অবকাঠামো রক্ষা প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।

গত ১১ জুলাই স্থানীয়রা মানববন্ধন করে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অথবা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নের দাবি জানান। স্থানীয়রা জানান, অতীতে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হলেও অনেক অংশ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

মুহুরী নদী ভারতের ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফেনী নদীতে মিশেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৭০ মিটার। ১৯৭৩ সালে মুহুরী সেচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়। ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে কাজ শেষ হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে বাঁধ সংস্কার ও পুর্ননির্মাণ হলেও বন্যার ঝুঁকি কমেনি।

ফুলগাজীর দৌলতপুরের নূর মিয়া বলেন, বারবার বাঁধ সংস্কার নয়, এবার টেকসই সমাধান চান তাঁরা। নদী ও বাঁধ ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।

একই এলাকার জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা বারবার বাঁধ ভাঙতে দেখেছি। বাঁধ মেরামত হয়, কিন্তু কয়েক বছর পর আবার একই সমস্যা দেখা দেয়। এবার এমনভাবে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে, যাতে দীর্ঘদিন মানুষ নিরাপদে থাকতে পারে।

শ্রীচন্দ্রপুরের অজিত কুমার বলেন, আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাঁধটি কত বছর টিকবে। সাময়িকভাবে মেরামত করে লাভ নেই। এবার এমন নির্মাণ চাই, যাতে বর্ষা এলেই বাঁধ নিয়ে আতঙ্কে থাকতে না হয়।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার যেন ভাঙনের পর সংস্কারের পুরোনো ধারার বদলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত হয়।

দৈনিক ফেনী

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধানে যত চ্যালেঞ্জ

প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ফেনীর উত্তরাঞ্চলে মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানে একনেকে অনুমোদিত ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ শিগগির শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে প্রকল্প শুরুর আগেই দৈনিক ফেনীর অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে নানা চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে এসেছে।

মুহুরী-কহুয়া নদী তীরবর্তী বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, নদীর প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকায় কোনো বাঁধ নেই। আবার বাঁধের ভেতরে রয়েছে সহস্রাধিক মানুষের বসতি, ধর্মীয় উপাসনালয়। কোথাও নদীর গতিপথ বদলে জেগেছে চর, কোথাও পুরোনো বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। পরশুরামের শালধর বাজার থেকে পরশুরাম হয়ে ছাগলনাইয়ার রেজু মিয়া পর্যন্ত সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে ফুলগাজীর জগতপুর থেকে রেজু মিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার অংশে বাঁধের অস্তিত্ব নেই বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ফলে নতুন প্রকল্পে শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, দীর্ঘদিনের বসতি, কৃষিজমি, ধর্মীয় স্থাপনা ও নদীর পরিবর্তিত গতিপথ বিবেচনায় রাখার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।

এ ব্যাপারে পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী ফাহাদ্দিস হোসেন বলেন, নদী সৃষ্টির পর থেকেই প্রায় ১৪ কিলোমিটার অংশে বাঁধ নেই।

ফুলগাজীর জগতপুর ব্রিজের কাছে নদী তীরবর্তী এলাকায় বাঁধ না থাকলেও ৫০-৬০টি পরিবার বসবাস করছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল ওয়াহাব বলেন, পানি বাড়লে এ এলাকার মানুষই আগে আতঙ্কে পড়ে। নতুন প্রকল্পে বাঁধহীন অংশের স্থায়ী সমাধান চান তাঁরা।

পুরোনো বাঁধের ভেতর ও নদীসংলগ্ন এলাকাতেও দীর্ঘদিন ধরে বসতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, এসব এলাকায় সহস্রাধিক মানুষ বসবাস করছে। দক্ষিণ বরইয়ায় একটি মসজিদ এবং দক্ষিণ শ্রীচন্দ্রপুরে একটি কালীমন্দির রয়েছে। নতুন বাঁধের নকশা ও বাস্তবায়নের সময় এসব স্থাপনা এবং বসতবাড়ির কী হবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

বরইয়ার হালিম বলেন, মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করছে। নতুন বাঁধ হলে বসতবাড়ি ও পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

নদীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও মূল স্রোত সরে গিয়ে চর জেগেছে, কোথাও স্রোত সরাসরি বাঁধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নদীর তীরে কৃষিজমিতেও চাষাবাদ চলছে। স্থানীয় কৃষক সাইফুল বলেন, চর জাগলে আমরা সেখানে চাষবাস করে থাকি। বাঁধ নির্মাণের সময় কৃষকের জমির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

মুহুরী-কহুয়া বাঁধ ভাঙার ইতিহাসও দীর্ঘ। পাউবোর বিভিন্ন সময়ের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত আট বছরে বাঁধটি অন্তত ৮৮ বার ভেঙেছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মুহুরী বাঁধের অন্তত ৮৬টি স্থানে ভাঙনের তথ্য রয়েছে। আর ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ১২২ কিলোমিটার বাঁধের অন্তত ১৯৫টি স্থানে ভাঙনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব ভাঙন সংস্কারে বিভিন্ন সময়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে নদীর বাঁধ সংস্কারে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায়ও বাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ মেরামত হলেও কয়েক বছর পর আবার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

এ ব্যাপারে পাউবো ফেনীর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শিহাব আহমেদ জানান, অনুমোদিত প্রকল্পে ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাশয় পুনঃখনন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ বা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মুহুরী প্রকল্পের ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার কাজ এখনো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যায়নি। তবে এই অর্থের প্রথম পর্যায়ের পরিকল্পনায় নদীর বাঁধ নির্মাণ, বাঁধের প্রতিরক্ষা ও নদী খননসহ বিভিন্ন কাজ রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি ছয় থেকে সাতটি সেকশনে ভাগ করে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নদীর বাঁধের ভেতরে সহস্রাধিক মানুষের বসতি ও ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে- এ বিষয়ে কোনো কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে চাইলে প্রকৌশলী শিহাব আহমেদ বলেন, বাঁধের ভেতরের এসব এলাকাকে ‘ফ্লাড প্লেইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বন্যার সময় কারও নিজস্ব জমিতে পানি উঠলে সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের পক্ষ থেকে কিছু করার থাকে না।

নদীর গতিপথ খননের সময় বাঁধের ভেতরের এসব বসতি ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি জেলা প্রশাসন বলতে পারবে। জগতপুর থেকে রেজু মিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকায় ফিজিবিলিটি স্টাডিতে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেভাবেই প্রকল্প পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ওই ১৪ কিলোমিটার এলাকায় প্রয়োজন নেই বলেই সেখানে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়নি। প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসন ৬৭ কিলোমিটার, নদী খনন ৮৪ কিলোমিটার এবং নদীর তীর প্রতিরক্ষা ১১ কিলোমিটার কাজের পরিকল্পনা রয়েছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন কমানো এবং কৃষিজমি ও অবকাঠামো রক্ষা প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।

গত ১১ জুলাই স্থানীয়রা মানববন্ধন করে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অথবা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নের দাবি জানান। স্থানীয়রা জানান, অতীতে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হলেও অনেক অংশ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

মুহুরী নদী ভারতের ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফেনী নদীতে মিশেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৭০ মিটার। ১৯৭৩ সালে মুহুরী সেচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়। ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে কাজ শেষ হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে বাঁধ সংস্কার ও পুর্ননির্মাণ হলেও বন্যার ঝুঁকি কমেনি।

ফুলগাজীর দৌলতপুরের নূর মিয়া বলেন, বারবার বাঁধ সংস্কার নয়, এবার টেকসই সমাধান চান তাঁরা। নদী ও বাঁধ ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।

একই এলাকার জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা বারবার বাঁধ ভাঙতে দেখেছি। বাঁধ মেরামত হয়, কিন্তু কয়েক বছর পর আবার একই সমস্যা দেখা দেয়। এবার এমনভাবে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে, যাতে দীর্ঘদিন মানুষ নিরাপদে থাকতে পারে।

শ্রীচন্দ্রপুরের অজিত কুমার বলেন, আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাঁধটি কত বছর টিকবে। সাময়িকভাবে মেরামত করে লাভ নেই। এবার এমন নির্মাণ চাই, যাতে বর্ষা এলেই বাঁধ নিয়ে আতঙ্কে থাকতে না হয়।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার যেন ভাঙনের পর সংস্কারের পুরোনো ধারার বদলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত হয়।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধানে যত চ্যালেঞ্জ
0:00 0:00
1.0x