ফেনী    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

১১ বছরে কমেছে ৪৪৮ হেক্টর

পরশুরামে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি



পরশুরামে আশঙ্কাজনক  হারে কমছে আবাদি জমি
ছবি: দৈনিক ফেনী

একসময় যে মাঠে ধানের শীষে দুলত সবুজের ঢেউ, সেখানে এখন কোথাও মাটির স্তূপ, কোথাও বসতঘর, আবার কোথাও রাস্তা কিংবা নতুন স্থাপনা। বন্যায় কোথাও জমেছে বালু, উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে অনাবাদি হয়ে গেছে ফসলি জমি। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিবার, কমেছে কৃষকের গড় জমির পরিমাণ। পরশুরামে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি, তার পরিসংখ্যান উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০০৮ ও ২০১৯ সালের কৃষি শুমারিতে।

শুমারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১১ বছরে পরশুরাম উপজেলায় কৃষিজমি কমেছে ১ হাজার ১০৭ একর, যা প্রায় ৪৪৮ হেক্টর। একই সময়ে বসতবাড়ির জমি বেড়েছে ৮১৭ একর বা প্রায় ৩৩১ হেক্টর। অর্থাৎ ওই সময়ে কৃষিজমি কমে বসতবাড়ির জমি বেড়েছে প্রায় ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

‎বিবিএসের কৃষি শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে পরশুরামে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৬২৩ একর। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫১৬ একরে। অর্থাৎ ১১ বছরে কমেছে ১ হাজার ১০৭ একর বা প্রায় ৪৪৮ হেক্টর। শতাংশের হিসাবে কৃষিজমি কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০০৮ সালে বসতবাড়ির জমি ছিল ১ হাজার ৬৮২ একর। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় ২ হাজার ৪৯৯ একর। ১১ বছরে বৃদ্ধি ৮১৭ একর বা প্রায় ৩৩১ হেক্টর।

‎মাঠপর্যায়ে পরিবর্তনের বিষয়টিও উঠে এসেছে জরিপকালে। উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এ এম খালেদ সরওয়ার বলেন, ২০০৮ সালে ১৯টি দাগগুচ্ছে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল। ওই দাগগুচ্ছগুলোর প্রায় ৫০ একর ভূমির মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটের আওতায় চলে গেছে। ফলে এসব এলাকায় কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে।

‎পরশুরামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে পরিবারের সংখ্যাও। ২০১১ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, উপজেলায় জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৬২ জন এবং পরিবার ছিল ২০ হাজার ৩৫৩টি। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৩১৭ জনে। পরিবারের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৫ হাজার ৯২৬টি। অর্থাৎ ১১ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ, আর পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

‎পরিবার বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে নতুন বসতবাড়ি, রাস্তা, দোকানপাট ও অন্যান্য অবকাঠামোর চাহিদা। পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা না থাকলে এ চাহিদার একটি অংশ কৃষিজমির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।

‎‎কৃষির সঙ্গে যুক্ত হোল্ডিংয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০০৮ সালে পরশুরামে কৃষি-সংশ্লিষ্ট হোল্ডিং ছিল ১৮ হাজার ১৫১টি। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৩০১টিতে—বৃদ্ধি প্রায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে কৃষিশ্রমিক পরিবারের সংখ্যা কমেছে। ২০০৮ সালে কৃষিশ্রমিক পরিবার ছিল ৩ হাজার ২২৯টি। ২০১৯ সালে তা নেমে আসে ২ হাজার ৪৯টিতে। অর্থাৎ কমেছে ১ হাজার ১৮০টি বা প্রায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

‎এদিকে প্রতি কৃষি হোল্ডিংয়ের গড় পরিচালিত জমির পরিমাণ দশমিক ৮৯ একর থেকে কমে হয়েছে দশমিক ৬৭ একর। অর্থাৎ কৃষির সঙ্গে যুক্ত হোল্ডিং বাড়লেও গড়ে কৃষকের পরিচালিত জমির আকার ছোট হয়েছে।

‎ভূমি ব্যবহারের সাম্প্রতিক চিত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিবিএসের ‘ভূমি ব্যবহার ও সেচ পরিসংখ্যান জরিপ ২০২৬’ অনুযায়ী, এক-ফসলি জমি ৪ হাজার ৩২০ একর থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৩৮৬ একর। দুই-ফসলি জমি ৯ হাজার ৮৭১ একর থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮৭৭ একরে।

‎তবে তিন-ফসলি জমির চিত্র বিপরীত। ৮৩৬ একর থেকে কমে তা হয়েছে ৭৯১ একর। অর্থাৎ তিন-ফসলি জমি কমেছে ৪৫ একর। একই জরিপে বনভূমি ১ হাজার ৯৬ একর থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৯১ একর এবং স্থায়ী ফসলের জমি ৭৩৭ একর থেকে বেড়ে ৭৩৮ একর হয়েছে। চলতি পতিত জমিও ১৪১ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪৫ একর। অর্থাৎ জমির মোট পরিমাণের পাশাপাশি জমি কীভাবে এবং কতটা নিবিড়ভাবে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে।

কৃষিতে আগ্রহ কমছে, বন্যায় জমছে বালু

কৃষিজমি কমার পেছনে শুধু বসতি সম্প্রসারণই দায়ী—এমনটা নয়। কৃষির উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জমির খণ্ডায়ন, শ্রমিক সংকট, ফসলের বাজারদরের অনিশ্চয়তা এবং বন্যা-জলাবদ্ধতার মতো বিষয়ও কৃষির ওপর চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের বাগমারা গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের দুলাল জানান, প্রায় ১৫ শতক জমি এবার তিনি আবাদ করেননি। তিনি বলেন, ধান চাষে যে খরচ হয়, ফসল বিক্রি করে তা ঠিকমতো উঠে আসে না। লোকসানের আশঙ্কায় তাই জমিটি অনাবাদি রেখেছি।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উৎপাদন ব্যয় কৃষির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শ্রমিকের মজুরি, শ্রমিক সংকট, সেচ ব্যয়, সার-বীজ ও কীটনাশকের দাম এবং ফসলের বাজারদরের অনিশ্চয়তা ছোট কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে কেউ জমি বর্গা দিচ্ছেন, কেউ অনাবাদি রাখছেন। আবার কোথাও জমির ব্যবহার পরিবর্তনের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। জমির খণ্ডায়নের কারণে ছোট আকারের জমিতে চাষ করে লাভ ধরে রাখাও অনেক কৃষকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কৃষিজমির ওপর আরেকটি বড় চাপ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি ঢুকে পরশুরামের বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় হাজার হেক্টর কৃষিজমি বালুচাপায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কোথাও কোথাও কয়েক ফুট পর্যন্ত বালু জমে জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

‎উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, পরশুরামে প্রতিবছর বিভিন্ন দুর্যোগে প্রায় ৪০-৫০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব দুর্যোগ শুধু ফসলের ক্ষতি করছে না, জমির উৎপাদনক্ষমতা ও কৃষকের আয়েও প্রভাব ফেলছে।

‎কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে মাটি ফেলে স্থাপনা নির্মাণের প্রভাব শুধু কৃষি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। নিচু জমি ভরাট হলে বৃষ্টির পানি ধারণের জায়গা কমে যেতে পারে। নালা বা প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার সময় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

‎২০০৮-০৯ সালের ভূমি জোনিং জরিপে মির্জানগরের প্রায় ৮১ শতাংশ, চিথলিয়ার ৭৭ শতাংশ এবং বক্সমাহমুদের ৭২ শতাংশ ভূমি কৃষিকাজে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

‎এ প্রসঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম শাফায়াত আখতার নূর বলেন, গত ১০-১৫ বছরে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি। তবে কৃষিজমি ভরাট বা মাটি কাটার অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে কৃষিজমির টপসয়েল কাটা ও ভরাটের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ১৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৬ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

‎এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতনু বড়ুয়া বলেন, কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। নালা ও চলাচলের পথ দখলের অভিযোগও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, সিএস নকশা অনুসরণ করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ চিহ্নিতকরণ এবং অবৈধ দখলের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কৃষিজমি রক্ষায় ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিস সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

দৈনিক ফেনী

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


পরশুরামে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি

প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একসময় যে মাঠে ধানের শীষে দুলত সবুজের ঢেউ, সেখানে এখন কোথাও মাটির স্তূপ, কোথাও বসতঘর, আবার কোথাও রাস্তা কিংবা নতুন স্থাপনা। বন্যায় কোথাও জমেছে বালু, উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে অনাবাদি হয়ে গেছে ফসলি জমি। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিবার, কমেছে কৃষকের গড় জমির পরিমাণ। পরশুরামে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি, তার পরিসংখ্যান উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০০৮ ও ২০১৯ সালের কৃষি শুমারিতে।

শুমারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১১ বছরে পরশুরাম উপজেলায় কৃষিজমি কমেছে ১ হাজার ১০৭ একর, যা প্রায় ৪৪৮ হেক্টর। একই সময়ে বসতবাড়ির জমি বেড়েছে ৮১৭ একর বা প্রায় ৩৩১ হেক্টর। অর্থাৎ ওই সময়ে কৃষিজমি কমে বসতবাড়ির জমি বেড়েছে প্রায় ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

‎বিবিএসের কৃষি শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে পরশুরামে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৬২৩ একর। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫১৬ একরে। অর্থাৎ ১১ বছরে কমেছে ১ হাজার ১০৭ একর বা প্রায় ৪৪৮ হেক্টর। শতাংশের হিসাবে কৃষিজমি কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০০৮ সালে বসতবাড়ির জমি ছিল ১ হাজার ৬৮২ একর। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় ২ হাজার ৪৯৯ একর। ১১ বছরে বৃদ্ধি ৮১৭ একর বা প্রায় ৩৩১ হেক্টর।

‎মাঠপর্যায়ে পরিবর্তনের বিষয়টিও উঠে এসেছে জরিপকালে। উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এ এম খালেদ সরওয়ার বলেন, ২০০৮ সালে ১৯টি দাগগুচ্ছে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল। ওই দাগগুচ্ছগুলোর প্রায় ৫০ একর ভূমির মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটের আওতায় চলে গেছে। ফলে এসব এলাকায় কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে।

‎পরশুরামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে পরিবারের সংখ্যাও। ২০১১ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, উপজেলায় জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৬২ জন এবং পরিবার ছিল ২০ হাজার ৩৫৩টি। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৩১৭ জনে। পরিবারের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৫ হাজার ৯২৬টি। অর্থাৎ ১১ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ, আর পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

‎পরিবার বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে নতুন বসতবাড়ি, রাস্তা, দোকানপাট ও অন্যান্য অবকাঠামোর চাহিদা। পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা না থাকলে এ চাহিদার একটি অংশ কৃষিজমির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।

‎‎কৃষির সঙ্গে যুক্ত হোল্ডিংয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০০৮ সালে পরশুরামে কৃষি-সংশ্লিষ্ট হোল্ডিং ছিল ১৮ হাজার ১৫১টি। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৩০১টিতে—বৃদ্ধি প্রায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে কৃষিশ্রমিক পরিবারের সংখ্যা কমেছে। ২০০৮ সালে কৃষিশ্রমিক পরিবার ছিল ৩ হাজার ২২৯টি। ২০১৯ সালে তা নেমে আসে ২ হাজার ৪৯টিতে। অর্থাৎ কমেছে ১ হাজার ১৮০টি বা প্রায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

‎এদিকে প্রতি কৃষি হোল্ডিংয়ের গড় পরিচালিত জমির পরিমাণ দশমিক ৮৯ একর থেকে কমে হয়েছে দশমিক ৬৭ একর। অর্থাৎ কৃষির সঙ্গে যুক্ত হোল্ডিং বাড়লেও গড়ে কৃষকের পরিচালিত জমির আকার ছোট হয়েছে।

‎ভূমি ব্যবহারের সাম্প্রতিক চিত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিবিএসের ‘ভূমি ব্যবহার ও সেচ পরিসংখ্যান জরিপ ২০২৬’ অনুযায়ী, এক-ফসলি জমি ৪ হাজার ৩২০ একর থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৩৮৬ একর। দুই-ফসলি জমি ৯ হাজার ৮৭১ একর থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮৭৭ একরে।

‎তবে তিন-ফসলি জমির চিত্র বিপরীত। ৮৩৬ একর থেকে কমে তা হয়েছে ৭৯১ একর। অর্থাৎ তিন-ফসলি জমি কমেছে ৪৫ একর। একই জরিপে বনভূমি ১ হাজার ৯৬ একর থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৯১ একর এবং স্থায়ী ফসলের জমি ৭৩৭ একর থেকে বেড়ে ৭৩৮ একর হয়েছে। চলতি পতিত জমিও ১৪১ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪৫ একর। অর্থাৎ জমির মোট পরিমাণের পাশাপাশি জমি কীভাবে এবং কতটা নিবিড়ভাবে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে।

কৃষিতে আগ্রহ কমছে, বন্যায় জমছে বালু

কৃষিজমি কমার পেছনে শুধু বসতি সম্প্রসারণই দায়ী—এমনটা নয়। কৃষির উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জমির খণ্ডায়ন, শ্রমিক সংকট, ফসলের বাজারদরের অনিশ্চয়তা এবং বন্যা-জলাবদ্ধতার মতো বিষয়ও কৃষির ওপর চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের বাগমারা গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের দুলাল জানান, প্রায় ১৫ শতক জমি এবার তিনি আবাদ করেননি। তিনি বলেন, ধান চাষে যে খরচ হয়, ফসল বিক্রি করে তা ঠিকমতো উঠে আসে না। লোকসানের আশঙ্কায় তাই জমিটি অনাবাদি রেখেছি।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উৎপাদন ব্যয় কৃষির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শ্রমিকের মজুরি, শ্রমিক সংকট, সেচ ব্যয়, সার-বীজ ও কীটনাশকের দাম এবং ফসলের বাজারদরের অনিশ্চয়তা ছোট কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে কেউ জমি বর্গা দিচ্ছেন, কেউ অনাবাদি রাখছেন। আবার কোথাও জমির ব্যবহার পরিবর্তনের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। জমির খণ্ডায়নের কারণে ছোট আকারের জমিতে চাষ করে লাভ ধরে রাখাও অনেক কৃষকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কৃষিজমির ওপর আরেকটি বড় চাপ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি ঢুকে পরশুরামের বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় হাজার হেক্টর কৃষিজমি বালুচাপায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কোথাও কোথাও কয়েক ফুট পর্যন্ত বালু জমে জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

‎উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, পরশুরামে প্রতিবছর বিভিন্ন দুর্যোগে প্রায় ৪০-৫০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব দুর্যোগ শুধু ফসলের ক্ষতি করছে না, জমির উৎপাদনক্ষমতা ও কৃষকের আয়েও প্রভাব ফেলছে।

‎কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে মাটি ফেলে স্থাপনা নির্মাণের প্রভাব শুধু কৃষি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। নিচু জমি ভরাট হলে বৃষ্টির পানি ধারণের জায়গা কমে যেতে পারে। নালা বা প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার সময় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

‎২০০৮-০৯ সালের ভূমি জোনিং জরিপে মির্জানগরের প্রায় ৮১ শতাংশ, চিথলিয়ার ৭৭ শতাংশ এবং বক্সমাহমুদের ৭২ শতাংশ ভূমি কৃষিকাজে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

‎এ প্রসঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম শাফায়াত আখতার নূর বলেন, গত ১০-১৫ বছরে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি। তবে কৃষিজমি ভরাট বা মাটি কাটার অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে কৃষিজমির টপসয়েল কাটা ও ভরাটের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ১৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৬ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

‎এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতনু বড়ুয়া বলেন, কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। নালা ও চলাচলের পথ দখলের অভিযোগও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, সিএস নকশা অনুসরণ করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ চিহ্নিতকরণ এবং অবৈধ দখলের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কৃষিজমি রক্ষায় ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিস সমন্বিতভাবে কাজ করছে।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
পরশুরামে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি
0:00 0:00
1.0x